ব্যাংকঋণে সরকারের বড় ঋণ প্রবৃদ্ধি

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের অভ্যন্তরীণ ব্যাংকঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৩ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বাজেটের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি অর্ধেকেরও বেশি, যা অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ধারাবাহিক চাহিদা এই ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সরকারের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। পাশাপাশি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত এবং সঞ্চয়পত্র থেকেও কিছু অংশ ঋণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে, তবে সেগুলোর প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

অর্থবছরের প্রথমার্ধে সরকারের ঋণ গ্রহণের কাঠামোয় স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেছে। একদিকে ব্যাংকঋণের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ প্রবাহ কমে এসেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বাজারে সুদের হার, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং বিকল্প বিনিয়োগ সুযোগের পরিবর্তনের প্রতিফলন।

সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের চিত্র

খাত২০২৫–২৬ অর্থবছর (প্রথম ৬ মাস)২০২৪–২৫ অর্থবছর (প্রথম ৬ মাস)পরিবর্তন
ব্যাংকঋণ৫৩,৩৮৬ কোটি টাকা৬,৭৪০ কোটি টাকাপ্রায় ৮ গুণ বৃদ্ধি
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত৮,৮৬১ কোটি টাকা২৪,৬৮৮ কোটি টাকা১৫,৮২৭ কোটি টাকা হ্রাস
সঞ্চয়পত্র (নিট)২,৪৬১ কোটি টাকাতুলনামূলক কমসীমিত প্রবৃদ্ধি
মোট অভ্যন্তরীণ ঋণ৬২,২৪৬ কোটি টাকা৩১,৪২৮ কোটি টাকাপ্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংকঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকঋণ প্রায় আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির পেছনে সরকারি ব্যয়ের চাপ বৃদ্ধি, বিশেষ করে বেতন-ভাতা, ভর্তুকি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ঋণ প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছরের ২৪ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা থেকে তা কমে চলতি বছরে ৮ হাজার ৮৬১ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হ্রাস এবং সাধারণ মানুষের বিকল্প বিনিয়োগে আগ্রহ বৃদ্ধিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চলতি বাজেটে সরকারের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা থাকায় বর্তমানে ব্যাংকঋণের এই বৃদ্ধি বেসরকারি খাতের ওপর তাত্ক্ষণিক চাপ সৃষ্টি করছে না। তবে ভবিষ্যতে যদি বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আসে, তাহলে সরকার ও বেসরকারি খাত একই উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার কারণে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সীমিত হয়ে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সব মিলিয়ে, সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণ প্রবণতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা, সুদের হার এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।