অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সরকারি ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ আনা এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। দায়িত্ব গ্রহণের প্রাথমিক দিনগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যয়সাশ্রয়ী পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পরিচালন খাতে ব্যয় বিপুল হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো পরিচালন ব্যয় দেশের মোট রাজস্ব আয়ের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতি আগামী সরকারের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, কারণ রাজস্ব আদায় এখনও লক্ষ্য অনুযায়ী কম।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি ব্যয়ের এই বৃদ্ধিতে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি এবং পদক্ষেপই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে, পে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর উপর দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি অনুমোদিত হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট প্রকল্প, সরকারি যানবাহন কেনার উদ্যোগ, এবং বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা কম। এ অবস্থায় পরিচালন ব্যয়ের বৃদ্ধি অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
পরিচালন ব্যয়ের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ (২০২৫-২৬)
| ব্যয় খাত | সম্প্রতি নেওয়া সিদ্ধান্ত | বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় (টাকা) |
|---|---|---|
| সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ও ভাতা | পে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১৪২% বৃদ্ধি | ১,০৬,০০০ কোটি |
| পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকিভাতা | ২০% বৃদ্ধি, পাঁচ ধাপ অনুযায়ী | ১০০ কোটি |
| গ্রাম পুলিশ বেতন ও অবসরকালীন ভাতা | বেতন ১,০০০ টাকা, ভাতা ২০,০০০ টাকা বৃদ্ধি | – |
| কূটনৈতিক মিশনের বৈদেশিক ভাতা | ২০–৩৩% বৃদ্ধি | ৩৫ কোটি |
| মন্ত্রী ফ্ল্যাট প্রকল্প | ৭২টি ফ্ল্যাট নির্মাণ | ৭৮৬ কোটি |
| সরকারি যানবাহন | তিন দফায় কেনার মূল্যসীমা বৃদ্ধি | – |
পরিচালন ব্যয়ের এই বৃদ্ধির মধ্যে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং ভাতা বৃদ্ধির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রায় ৭৬৪ জন সাবেক কর্মকর্তাকে উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদোন্নতি দেওয়া হয়, যার ফলে সরকারে স্থায়ী আর্থিক দায় বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ ভাতা ও অন্যান্য ভাতার দ্বিগুণীকরণও ব্যয় বাড়িয়েছে।
অর্থমন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫-২৬ সময়কালে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৯০,৫৯৭ কোটি টাকা, যা বাজেটের ১১.৪৭%। এর আগে এ হার ছিল ১০.২৩%। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বাজেট ছিল ৭,৯৭,০০০ কোটি, যেখানে পরিচালন ব্যয় ৪,৭৪,১৪৩ কোটি টাকা, অথচ রাজস্ব আদায় মাত্র ৪,৩৮,৫৭১ কোটি। অর্থাৎ পরিচালন ব্যয় রাজস্ব আয়ের চেয়ে ৩৫,৫৭২ কোটি টাকা বেশি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, রাজস্ব বৃদ্ধির পদক্ষেপ ছাড়া এত বড় পরিচালন ব্যয় দেশের জন্য সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকটের সূচনা করতে পারে। সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, “এ ধরনের ব্যয় সামলাতে যথেষ্ট রাজস্ব উৎস থাকা প্রয়োজন। তা না হলে মহাসংকট দেখা দিতে পারে।”
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মন্তব্য করেছেন, “অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় ব্যয় কমানোর কথা বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচনী সরকারের মতো আচরণ দেখা যাচ্ছে। পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, উন্নয়ন ব্যয় কমছে; যা জনকল্যাণমুখী নয়।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার জন্য এখনই প্রয়োজন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের উপর নজর দেওয়া।
