বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য খাতে সংকট গভীর হচ্ছে। দীর্ঘ ২৫ বছরের অগ্রগতির পর এবার প্রথমবারের মতো প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যু বাড়তে চলেছে। গেটস ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—২০২৫ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু অতিরিক্ত ২ লাখ বাড়তে পারে। এই প্রক্ষেপণ শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে বড় ধরনের বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, তার সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত।
Table of Contents
শিশুমৃত্যুর দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি থেমে যাচ্ছে
২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী শিশুমৃত্যু অর্ধেকে নেমে এসেছিল। উন্নত টিকাদান কর্মসূচি, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পুষ্টি সেবা এবং নারী–শিশু স্বাস্থ্য উন্নয়ন—সবকিছু মিলে গত দুই দশকে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়।
২০২৩ সালে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৬ লাখ, যা ২০ বছর আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। কিন্তু চলতি বছর এই সংখ্যা ৪৮ লাখে উঠতে পারে, যা শিশুসুরক্ষা অগ্রগতির গতি উল্টো দিকে যাওয়ার প্রথম বড় সংকেত।
সংকটের কেন্দ্র: আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়া
গেটস ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—
২০২৫ সালে স্বাস্থ্য খাতে বৈশ্বিক উন্নয়ন সহায়তা ২৭ শতাংশ কমেছে
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি সহ বড় অর্থদাতা দেশগুলো স্বাস্থ্য তহবিল কমিয়েছে
দাতাদের এই সংকোচনের প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর
এসডিজির (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য) অগ্রগতি পর্যালোচনাও এ কারণে বিলম্বিত হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে অনিশ্চয়তা এতটাই বেশি যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও তাদের পরিকল্পনা পুনর্গঠন করতে পারছে না।
দেনায় জর্জরিত দেশগুলোর পরিস্থিতি আরও নাজুক
বহু নিম্ন আয়ের দেশ এখন ঋণচাপে জর্জরিত। এই কারণে স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখতে পারছে না। এর ফলে—
টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে
পুষ্টি সেবা কমে যাচ্ছে
শিশুবান্ধব স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে কর্মী সংকট দেখা দিচ্ছে
জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে
এই পরিস্থিতি শিশুমৃত্যুর হার বাড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সম্ভাব্য “হারানো দশক”
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি তহবিল সংকট আগামী পাঁচ–ছয় বছর স্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্বের বহু দেশের শিশুসুরক্ষা অগ্রগতি এক দশক পিছিয়ে যেতে পারে।
গেটস ফাউন্ডেশনের হিসাব—
২০৪৫ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ শিশু মারা যেতে পারে।
এটি মানবতার জন্য এক বিশাল ব্যর্থতা, কারণ এই মৃত্যুর বিপুল অংশই প্রতিরোধযোগ্য।
কেন শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?
১. শিশুরা সংক্রামক রোগে সংবেদনশীল
2. টিকাদানে বিঘ্ন ঘটলে মৃত্যুহার দ্রুত বাড়ে
3. পুষ্টির ঘাটতি স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি আনে
4. মাতৃস্বাস্থ্য সংকট শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ
স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তর দুর্বল হলে শিশু–মৃত্যুর বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়ে।
সমাধান: দ্রুত ও সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগ প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে—
আন্তর্জাতিক তহবিল পুনরুদ্ধার জরুরি
ঋণগ্রস্ত দেশগুলোকে স্বাস্থ্যখাতে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে
টিকাদান ও জরুরি চিকিৎসা সেবা অগ্রাধিকার পেতে হবে
মহামারি–পরবর্তী স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন অপরিহার্য
বৈশ্বিক দাতাদের মধ্যে নতুন সমন্বয় কাঠামো গঠন করা জরুরি
বিশ্ব যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে প্রতিরোধযোগ্য শিশুমৃত্যুর এই ঊর্ধ্বগতি বহু বছর ধরে থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।
