বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কৃত্রিম চাপের শঙ্কা

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সক্রিয়—এমন সন্দেহ প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ডলারের বিনিময় হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, যার মাধ্যমে কিছু পক্ষ আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে বাজারে একধরনের ভীতি তৈরি করা হয়েছে। কিছু মহল থেকে প্রচার করা হচ্ছে যে, ডলারের দর শিগগিরই ১৩০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। এ ধরনের অপপ্রচার ব্যাংক ও ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং বাজারে অস্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছে।

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ কমিয়ে দিয়ে নজরদারি বাড়িয়েছে। সাধারণত ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার উদ্বৃত্ত একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার ক্রয় করে রিজার্ভ শক্তিশালী করে। তবে সাম্প্রতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় এই ক্রয় কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, যাতে বিনিময় হারে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে প্রাপ্ত অর্থ দেশের মোট প্রবাসী আয়ের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে, যা সামগ্রিক বাজারকে শক্তিশালী রাখার কথা।

নিম্নে সাম্প্রতিক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো—

সূচকপরিমাণ
মার্চ মাসে প্রবাসী আয়৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার
ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকের মজুত২.৩০ বিলিয়ন ডলার
মার্চ মাসে ব্যাংকের মজুত৩.৯০ বিলিয়ন ডলার
আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলার দর১২২.৮৫ টাকা
প্রবাসী আয়ের ক্রয়দর১২৩.৫০ টাকা
খোলা বাজারে ডলার দর১২৫.৫০ টাকা

একাধিক ব্যাংকার জানান, বাজারে ডলারের প্রকৃত চাহিদা কম থাকা সত্ত্বেও বিনিময় হার বেড়ে চলেছে, যা অস্বাভাবিক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার উদ্বৃত্ত এক বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা বাজারে সরবরাহ বাড়ারই ইঙ্গিত দেয়।

তবে কিছু ব্যাংকে আগাম ডলার ক্রয়চুক্তির প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃত্রিমভাবে চাহিদা তৈরি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে ডলারের দরে অযৌক্তিক ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে সরেজমিনে পরিদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, উচ্চ দরের কারণে তারা ডলার ক্রয়ে আগ্রহী নন, কারণ বাজারে প্রকৃত চাহিদা নেই। অপরদিকে, একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যাংক কৃত্রিমভাবে দর বাড়ানোর পেছনে ভূমিকা রাখছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় ভবিষ্যতে দাম সমন্বয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই ধরনের বার্তা বাজারে জল্পনা-কল্পনা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং কিছু গোষ্ঠী তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বাজারের মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম চাপের কারণে ডলারের দর বাড়ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।