বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি মামলায় ১৬ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুসহ মোট ১৬ জনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন আদালত। সোমবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আদালতের আদেশ অনুযায়ী, মামলার তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তদের কেউ যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে আদালতে বলা হয়, অভিযুক্তরা বিদেশে পালিয়ে গেলে চলমান তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে তাদের বিদেশ যাত্রা আপাতত বন্ধ রাখা প্রয়োজন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা পরস্পরের সঙ্গে যোগসাজশ করে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, ঋণ অনুমোদন এবং অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিয়ম, জাল নথিপত্র ব্যবহার এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, মামলার প্রাথমিক তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ১২ জুন অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়। পরে বিশেষ জজ আদালত-১ মামলাটি পর্যালোচনা করে কিছু পর্যবেক্ষণসহ অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন এবং বিষয়টি পুনরায় দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে পাঠান। বর্তমানে মামলার অধিকতর তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং তদন্ত কর্মকর্তারা নতুন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের উপসহকারী পরিচালক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ জালাল আদালতে করা আবেদনে উল্লেখ করেন, গোপন সূত্রে জানা গেছে যে মামলার কয়েকজন অভিযুক্ত দেশত্যাগের চেষ্টা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে তারা বিদেশে পালিয়ে গেলে মামলার তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রমে গুরুতর বিঘ্ন ঘটতে পারে। এই কারণে আদালতের মাধ্যমে তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা জরুরি হয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, এর আগে মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি কয়েকজন অভিযুক্তের বিদেশ গমনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেছিলেন। সে সময় আদালত ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ায় আবার নতুন করে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।

এই মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে কোরবান আলী নামে একজন ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে আদালতকে জানানো হয়েছে।

মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—

বিষয় | তথ্য
মামলার ধরন | ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাৎ
অভিযুক্তের সংখ্যা | ১৬ জন
প্রধান অভিযুক্ত | শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু (সাবেক চেয়ারম্যান)
অভিযোগের পরিমাণ | প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা
অভিযোগের ধরন | ক্ষমতার অপব্যবহার, যোগসাজশ ও অর্থ আত্মসাৎ
তদন্তকারী সংস্থা | দুর্নীতি দমন কমিশন
আদালতের সিদ্ধান্ত | অভিযুক্তদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
মামলার অবস্থা | অধিকতর তদন্ত চলমান

অভিযুক্তদের তালিকায় আরও রয়েছেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম সাজেদুর রহমান, সাবেক প্রধান নির্বাহী কাজী ফখরুল ইসলাম, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুস সোবহান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক ও কোম্পানি সচিব শাহ আলম ভূইয়া, সাবেক পরিচালক জাহাঙ্গীর আখন্দ সেলিম, শুভাশিষ বোস, নিলুফার আহমেদ, ড. কাজী আক্তার হোসাইন, আনোয়ারুল ইসলাম, গুলশান শাখার সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক সিপার আহমেদ, তাহমিনা ডেনিম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসির আহমেদ খান, চেয়ারম্যান কামাল জামান মোল্লা, পরিচালক কাজী রিজওয়ানা মোমিনুল হক এবং প্রধান জরিপকারী জসিম উদ্দিন চৌধুরী।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অঙ্কের আর্থিক দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্তদের বিদেশ যাত্রা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সহজ হয়।

বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি দেশের ব্যাংকিং খাতে বহুল আলোচিত একটি দুর্নীতির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, মামলার সব তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে তদন্ত সম্পন্ন করা হলে পরবর্তী সময়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।