বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে আগামী মাস থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্যায়ে একযোগে বড় ধরনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। সর্বোচ্চ চাকরির বয়সসীমা পূর্ণ হওয়া, নির্ধারিত চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বেচ্ছা পদত্যাগ—এই তিনটি প্রধান কারণে একাধিক ব্যাংকে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন আর নিছক প্রশাসনিক রদবদল নয়; বরং এটি ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং করপোরেট সুশাসনের মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
খাতের নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও মিডল্যান্ড ব্যাংকে ফেব্রুয়ারি মাসেই নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। দুই ব্যাংকই অভ্যন্তরীণভাবে বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে; এখন কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের অপেক্ষা। একই সময়ে ইস্টার্ন ব্যাংকও নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর বাইরে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকা ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক এবং সাউথইস্ট ব্যাংকে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে শীর্ষ পদে পরিবর্তন এসেছে ব্র্যাক ব্যাংকেও।
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সর্বোচ্চ ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ফলে বয়সজনিত অবসরই এখন শীর্ষ নির্বাহী পদ শূন্য হওয়ার প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা বলছেন, এই বাস্তবতায় অভিজ্ঞ, দক্ষ এবং প্রশ্নাতীত সুনামের পেশাদার খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। কারণ, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকে এখন শুধু প্রচলিত ব্যাংকিং দক্ষতাই নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানের করপোরেট সুশাসন, ডিজিটাল রূপান্তর, কঠোর নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডে অনুগত থাকা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে স্থিতিশীল নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা প্রত্যাশিত।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাসেম মো. শিরীন আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি অবসরে যাচ্ছেন। ২০১৬ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সময়ে ব্যাংকটির প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ, এটিএম নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে অগ্রগতি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। পরিচালনা পর্ষদ তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান করপোরেট ব্যবসা কর্মকর্তা ইহতেশামুল হক খানকে নির্বাচন করেছে।
অন্যদিকে, মিডল্যান্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান-উজ জামানের মেয়াদ শেষ হবে ২৪ ফেব্রুয়ারি। ২০১৪ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করা এই ব্যাংকারের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ ইউ আহমেদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইস্টার্ন ব্যাংকেও বড় পরিবর্তন আসছে। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক দায়িত্ব পালন করা আলী রেজা ইফতেখারের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৯ এপ্রিল। ব্যাংকটি ইতোমধ্যে দেশ ও বিদেশে কর্মরত অভিজ্ঞ বাংলাদেশি ব্যাংকারদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে।
নিচের সারণিতে সাম্প্রতিক ও আসন্ন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্যায়ের পরিবর্তনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো—
| ব্যাংকের নাম | বিদায়ী/বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক | মেয়াদ শেষ/যোগদানের সময় | নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক |
|---|---|---|---|
| ডাচ্-বাংলা ব্যাংক | আবুল কাসেম মো. শিরীন | ৬ ফেব্রুয়ারি | ইহতেশামুল হক খান |
| মিডল্যান্ড ব্যাংক | আহসান-উজ জামান | ২৪ ফেব্রুয়ারি | ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ |
| ঢাকা ব্যাংক | — | জানুয়ারি | ওসমান এরশাদ |
| মেঘনা ব্যাংক | — | সম্প্রতি | সৈয়দ মিজানুর রহমান |
| সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক | — | সম্প্রতি | এস এম মইনুল কবির |
| সাউথইস্ট ব্যাংক | — | সম্প্রতি | খালিদ মাহমুদ |
| ব্র্যাক ব্যাংক | — | সেপ্টেম্বর | তারেক রেফাত উল্লাহ খান |
সমষ্টিগতভাবে এসব নেতৃত্ব পরিবর্তন বেসরকারি ব্যাংক খাতের নীতিনির্ধারণ, প্রতিযোগিতা ও সেবার মানে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রক অনুগততা, উদ্ভাবন এবং সতর্ক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন—সেই সক্ষমতার ওপরই আগামী দিনে খাতটির গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
