বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ১১টি বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের ওপর পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমান বীমা শিল্পের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি। সলার্স নামক আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের এই গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বীমা খাতের পরিচালনাগত দক্ষতা আমূল বৃদ্ধি করলেও এটি মানুষের সহমর্মিতা ও সরাসরি যোগাযোগের বিকল্প হতে পারবে না।
Table of Contents
বীমা শৃঙ্খলে প্রযুক্তির বহুমুখী প্রভাব
জরিপে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, বীমা খাতের সম্পূর্ণ মান শৃঙ্খল বা ভ্যালু চেইনে এই প্রযুক্তির প্রভাব বিস্তৃত। বিশেষ করে অসংগঠিত বা অগোছালো উপাত্ত বিশ্লেষণে এটি অভাবনীয় সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। সলার্স-এর সভাপতি এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা মিশাল ট্রোচিমজুক এর মতে, ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ হবে প্রধান চাবিকাঠি। আর এই লক্ষ্য অর্জনে স্বয়ংক্রিয়করণ, আধুনিক রেটিং পদ্ধতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঝুঁকি নির্বাচনের মতো উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি।
জরিপে অংশগ্রহণকারী শীর্ষ কর্মকর্তাদের তালিকা
এই বিশেষ গবেষণায় যারা তাদের মতামত প্রদান করেছেন, তাদের একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| কর্মকর্তার নাম | পদবি ও প্রতিষ্ঠান | দেশ/অঞ্চল |
| ফ্রাঙ্ক ওয়ালথেস | প্রধান নির্বাহী, ভিকেবি | জার্মানি |
| অ্যান্ড্রু হর্টন | প্রধান নির্বাহী, কিউবিই | অস্ট্রেলিয়া |
| সাইমন উইলসন | প্রধান নির্বাহী, মার্কেল ইন্স্যুরেন্স | যুক্তরাষ্ট্র |
| জ্যঁ-দানিয়েল লাফেলে | প্রধান নির্বাহী, লা ভাদোয়া | সুইজারল্যান্ড |
| কেন নরগ্রোভ | প্রধান নির্বাহী, ইনট্যাক্ট ইউকেঅ্যান্ডআই | যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড |
| মার্কাস রিউ | ব্যাটারি ভেঞ্চারস | যুক্তরাষ্ট্র |
| ইসাবেল লে বট | প্রধান নির্বাহী, লা ফ্রান্স মিউচুয়ালিস্ট | ফ্রান্স |
| অ্যাগনেস প্যাকুইন | প্রধান নির্বাহী, সিএনপি অ্যাসুরেন্স | ফ্রান্স |
| আন্দ্রেজ স্লাপার | প্রধান নির্বাহী, ট্রিগ্লাভ | স্লোভেনিয়া |
| ড. জুরগ শিল্টকনেট | প্রধান নির্বাহী, হেলভেটিয়া জার্মানি | জার্মানি |
| ব্রেন্ডা গিবসন | প্রধান নির্বাহী, রেড রিভার মিউচুয়াল | কানাডা |
সহমর্মিতা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের অপরিহার্যতা
প্রধান নির্বাহীরা একমত হয়েছেন যে, প্রযুক্তি যেন কোনোভাবেই মানুষের ব্যক্তিগত স্পর্শ ও সরাসরি আলাপচারিতাকে ম্লান না করে। বীমা মূলত বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি ব্যবস্থা, যেখানে সহমর্মিতা বা এমপ্যাথি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে মানুষের কাজের পরিধিকে সমৃদ্ধ করা এবং ব্যক্তিগত সেবাকে আরও নিখুঁত করা, কিন্তু এটি কোনোভাবেই সরাসরি মানুষের মুখোমুখি যোগাযোগের স্থান দখল করতে পারবে না।
আগামীর বীমা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির বিচরণ
সলার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বীমা খাতের প্রতিটি ধাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। এর সম্ভাব্য প্রয়োগের ক্ষেত্রগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
পণ্যের নকশা ও মূল্য নির্ধারণ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে গ্রাহকভেদে পলিসির ধরন ও নিখুঁত প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
বিমা দাবি স্বয়ংক্রিয়করণ: ছোট ও মাঝারি বিমা দাবিগুলো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি হবে।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: উন্নত ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিগুলো আগেভাগেই শনাক্ত করা যাবে।
গ্রাহক সেবা: ডিজিটাল সহকারীর মাধ্যমে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সার্বিকভাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বীমা শিল্পকে আরও দক্ষ, সাশ্রয়ী ও আধুনিক করে তুলবে। তবে এই প্রযুক্তির মূল সাফল্য নির্ভর করবে মানবিক সংবেদনশীলতার সাথে প্রযুক্তির সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর। বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মতে, প্রযুক্তির জয়জয়কারের মাঝেও সরাসরি গ্রাহক সেবা এবং মানুষের প্রতি মানুষের যে সহানুভূতি, তাই হবে এই খাতের সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি। প্রযুক্তি শুধু কাজের গতি বাড়াবে, কিন্তু আস্থার সম্পর্কটি তৈরি হবে মানবিক গুণাবলির মাধ্যমেই।
