পৃথিবীর প্রতিটি খাবার, প্রতিটি খামার এবং প্রতিটি বাস্তুসংস্থানের হৃদয়ে লুকিয়ে আছে সভ্যতার এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইঞ্জিন: বীজ। ১০,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষ এবং বীজের মধ্যকার সম্পর্কটি একটি পবিত্র ও অলিখিত বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল। কৃষকরা কেবল বীজের ‘ব্যবহারকারী’ ছিলেন না; তারা ছিলেন জীববৈচিত্র্যের রক্ষক এবং জেনেটিক অভিযোজনের বিশ্বের দীর্ঘতম গবেষণাগারের প্রধান গবেষক। প্রকৃতির এই ‘বৃত্তাকার অর্থনীতি’ (Circular Economy) ধান, গম এবং শাকসবজির হাজার হাজার বৈচিত্র্যের এক বিশাল তন্তু তৈরি করেছিল—যার প্রতিটিই স্থানীয় মাটি, নির্দিষ্ট কীটপতঙ্গ এবং জলবায়ুর খামখেয়ালি ছন্দের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম ছিল।
এই প্রাচীন রীতিতে বীজ ছিল একটি ‘কমনস’ (Commons) বা সর্বজনীন সম্পদ। এটি এমন একটি ভাগ করা সম্পদ ছিল যা সবার এবং একই সাথে কারোরই একার নয়; এটি ছিল ভবিষ্যতের বেঁচে থাকার জন্য অতীতের দেওয়া এক উপহার। হিমালয়ের পাদদেশের সুগন্ধি বাসমতী হোক বা আন্দিয়ান উচ্চভূমির খরা-সহনশীল ভুট্টা—সব বীজই এই বিশ্বাসে সংরক্ষণ, নির্বাচন এবং আদান-প্রদান করা হতো যে, জীবনকে কখনোই ব্যক্তিগত মালিকানাধীন করা যায় না।

Table of Contents
জীবনের বেষ্টনী (The Enclosure of Life)
তবে গত শতাব্দীতে এক আমূল, আগ্রাসী এবং ঐতিহাসিকভাবে নজিরবিহীন পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। যা একসময় মানবজাতির সাধারণ ঐতিহ্য ছিল, তা দ্রুত ব্যক্তিগত ‘মেধাসম্পদে’ রূপান্তরিত হচ্ছে। আমরা বর্তমানে জৈবিক জগতের এক ‘আইনি বেষ্টনী’র মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে গুটিকয়েক বহুজাতিক কর্পোরেশনের মুনাফার জন্য জীবনের ভিত্তিগুলোকে পেটেন্ট করা হচ্ছে, বেসরকারীকরণ করা হচ্ছে এবং জিনগতভাবে পরিবর্তন (Genetically Modified) করা হচ্ছে।
আজ বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থা এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে শিল্পায়ন মডেল (Industrial Model)—ডঃ বন্দনা শিব যাকে বলেন “মনের একফসলী সংস্কৃতি” (Monocultures of the Mind)। এই মডেলে জীবনকে কেবল একটি ‘সফটওয়্যার’ হিসেবে দেখা হয়, যা কেবল নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক ‘হার্ডওয়্যার’ (সার ও কীটনাশক)-এর মাধ্যমে চলার জন্য তৈরি। এটি মানসম্মত, বন্ধ্যা অথবা রাসায়নিক-নির্ভর বীজের এক জগত যা পুনর্নবীকরণের ১০,০০০ বছরের চক্রকে ভেঙে দেয়।
অন্যদিকে রয়েছে বীজ সার্বভৌমত্ব আন্দোলন (Seed Sovereignty Movement)। ডঃ শিব এবং ‘নবধান্য’ ও ‘লা ভিয়া ক্যাম্পেসিনা’র মতো তৃণমূল সংগঠনের নেতৃত্বে এই আন্দোলন গড়ে উঠেছে। ‘বীজ সার্বভৌমত্ব’ (বা বীজ স্বরাজ) হলো বীজ সংরক্ষণ, ব্যবহার এবং বিনিময়ের মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারের এক বৈশ্বিক ডাক। এই আন্দোলন যুক্তি দেয় যে, বীজ কোনো কর্পোরেট উদ্ভাবন নয়, বরং এটি জৈবিক বুদ্ধিমত্তার এক জীবন্ত আর্কাইভ এবং মানুষের স্বাধীনতার অন্যতম পূর্বশর্ত।

আদিম ইঞ্জিন – বীজের জৈবিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস
যুগ যুগ ধরে বীজ আমাদের পৃথিবীর এক নীরব স্থপতি হিসেবে কাজ করেছে। বীজ সার্বভৌমত্বের বর্তমান লড়াইকে বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে কৃষি রক্ষণাবেক্ষণের দশ হাজার বছরের দীর্ঘ “সুবর্ণ যুগের” দিকে তাকাতে হবে। এই সময়কালটি ছিল মানুষের সংস্কৃতি এবং জৈবিক বুদ্ধিমত্তার মধ্যকার এক সহ-বিবর্তনীয় মেলবন্ধন—এমন এক অংশীদারিত্ব যা সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
১০,০০০ বছরের চুক্তি: পবিত্র বিশ্বাস হিসেবে সহ-বিবর্তন
প্রায় ১২,০০০ বছর আগে মানবজাতি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছিল। শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ থেকে স্থায়ী কৃষিতে উত্তরণ—যা ‘নব্যপ্রস্তর বিপ্লব’ (Neolithic Revolution) নামে পরিচিত—তা কেবল খাদ্য সংগ্রহের পদ্ধতির পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল মানুষের মনস্তত্ত্বের এক মৌলিক রূপান্তর। আমরা প্রকৃতির কেবল পর্যবেক্ষক হওয়া ছেড়ে তার প্রধান ‘সহ-স্রষ্টা’ হয়ে উঠলাম।
“উৎপত্তিস্থল” বা ‘সেন্টারস অফ অরিজিন’—যেমন উর্বর চন্দ্রকলা বা ফার্টিল ক্রিসেন্ট (গম ও বার্লি), ইয়াংসি ও হলুদ নদী উপত্যকা (ধান), মেসোআমেরিকান উচ্চভূমি (ভুট্টা) এবং আন্দিজ পর্বতমালা (আলু)—আমাদের পূর্বপুরুষরা উদ্ভিদ জগতের সাথে এক নীরব চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, বুনো শস্যের মধ্য থেকে সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সহনশীল এবং পুষ্টিকর দানাগুলো বেছে নিয়ে তারা তাদের বংশধরের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে পারেন।
এভাবেই জন্ম নেয় বীজ রক্ষণাবেক্ষণ (Seed Stewardship)। ১০,০০০ বছর ধরে বীজের এই “প্রযুক্তি” ছিল বিকেন্দ্রীকৃত এবং ওপেন-সোর্স। তখন কোনো গবেষণাগার বা পেটেন্ট ছিল না। তার বদলে প্রতিটি কৃষক ছিলেন এক একজন পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানী। বৃষ্টির ছায়া ঘেরা উপত্যকা থেকে শুরু করে প্রখর রোদ পোড়ানো সমভূমি—বিভিন্ন ক্ষুদ্র জলবায়ুতে বীজ রোপণ করার মাধ্যমে কৃষকরা জেনেটিক অভিযোজনের বিশ্বের দীর্ঘতম পরীক্ষায় লিপ্ত হয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়াটি, যা ‘কৃত্রিম নির্বাচন’ (Artificial Selection) নামে পরিচিত, বুনো ঘাসকে এমন সব প্রধান খাদ্যে রূপান্তরিত করেছে যা আজ কোটি কোটি মানুষের ক্ষুধা মেটাচ্ছে।
জীবন্ত আর্কাইভ হিসেবে বীজ: জৈবিক বুদ্ধিমত্তা
বীজ কোনো জড় বস্তু বা নিছক পণ্য নয়; এটি একটি জীবন্ত আর্কাইভ (Living Archive)। এর অণুবীক্ষণিক খোসার ভেতরে একটি বীজ হাজার হাজার বছরের মানুষ ও প্রকৃতির মিথস্ক্রিয়ার স্মৃতি বহন করে।
প্রথাগত জাতগুলো, যেগুলোকে প্রায়ই ‘ল্যান্ডরেস’ (Landraces) বলা হয়, সেগুলো অনন্য কারণ তারা “জনসংখ্যা-ভিত্তিক” (Population-based)। শিল্পজাত বীজের বিপরীতে, যা অভিন্ন জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের (Uniformity) জন্য তৈরি করা হয়, প্রথাগত ধানের বীজের একটি ব্যাগে উচ্চমানের জেনেটিক বৈচিত্র্য থাকে।
অভিযোজন ক্ষমতা: যদি কোনো ল্যান্ডরেস বা স্থানীয় জাতের ক্ষেতে তীব্র খরা আঘাত হানে, তবে কিছু গাছ মারা যাবে ঠিকই, কিন্তু অন্যগুলো—যাদের মধ্যে খরা-সহনশীলতার বিশেষ জেনেটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে—বেঁচে থাকবে। এই টিকে থাকা গাছগুলোই পরের বছরের জন্য বীজ সরবরাহ করে, যা নিশ্চিত করে যে ফসলটি সর্বদা তার পরিবেশের সাথে মানানসই থাকছে।
মাটির স্মৃতি: ল্যান্ডরেসগুলো “স্থান-নির্দিষ্ট” (Site-specific)। হিমালয়ের ঢালে জন্মানো গমের একটি জাত গঙ্গার বদ্বীপ অঞ্চলে জন্মানো একই জাতের গম থেকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এটি এমন এক স্থানীয় জৈবিক স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করে যা কোনো গবেষণাগারে নকল করা সম্ভব নয়।
সাংস্কৃতিক মাত্রা: সমাজের বুনন হিসেবে বীজ
বীজের ইতিহাস মূলত মানুষের অভিবাসন এবং আচারেরও ইতিহাস। প্রতিটি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে বীজকে “আত্মীয়” বা “ঐশ্বরিক উপহার” হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
ভারত: বৈদিক ঐতিহ্যে বীজ হলো ‘বীজ’ (Bija), যা সকল সম্ভাবনার উৎস। এটি অন্নদাত্রী দেবী অন্নপূর্ণার সাথে যুক্ত। বীজ কখনোই বিক্রির জন্য কোনো ‘জিনিস’ ছিল না; এগুলো ছিল বিয়েতে উপহার দেওয়ার সামগ্রী, উৎসবে ভাগ করে নেওয়ার সম্পদ এবং মায়ের কাছ থেকে মেয়ের কাছে হস্তান্তরিত হওয়া উত্তরাধিকার।
আমেরিকা: মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার কাছে ভুট্টা কেবল একটি ফসল ছিল না; এটি ছিল মানবতার সারসত্তা। মায়ান পবিত্র গ্রন্থ ‘পোপোল ভুহ’ (Popol Vuh) দাবি করে যে, মানুষকে আক্ষরিক অর্থেই ভুট্টা দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল।
বৃত্তাকার অর্থনীতি: এই সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধা একটি ‘শেয়ারিং বা বিনিময়ের বৃত্তাকার অর্থনীতি’ তৈরি করেছিল। যেহেতু বীজকে একটি সর্বজনীন সম্পদ (Commons) হিসেবে দেখা হতো, তাই এটি সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অবাধে আদান-প্রদান হতো। জেনেটিক্সের এই অবাধ সংমিশ্রণ নিশ্চিত করেছিল যে জীববৈচিত্র্য কেবল টিকেই থাকবে না—বরং তা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ধারণা করা হয় যে, ভারতীয় কৃষকরা ধানেরই ২,০০,০০০-এর বেশি জাত চাষ করতেন।
সর্বজনীন ঐতিহ্যের অবক্ষয়
বিংশ শতাব্দীতে একটি “রৈখিক” (Linear) যুক্তি প্রবর্তিত হয় যা এই ১০,০০০ বছরের চুক্তি ভেঙে দিতে চেয়েছিল। শিল্পজাত মানসিকতা বীজের নিজের পুনরুৎপাদন ক্ষমতাকে একটি “বাজারের ব্যর্থতা” হিসেবে দেখতে শুরু করে। যদি একজন কৃষক নিজের বীজ নিজেই সংরক্ষণ করতে পারেন, তবে একটি কর্পোরেশন তার কাছে নতুন বীজ বিক্রি করতে পারবে না।
রক্ষণাবেক্ষণ (Stewardship) থেকে মালিকানায় (Ownership) এই রূপান্তর শুরু হয় বীজের পণ্যকরণের মাধ্যমে। বীজের সাংস্কৃতিক এবং জৈবিক ইতিহাস কেড়ে নিয়ে শিল্পায়ন মডেল আজকের এই “একফসলী সংস্কৃতি” বা ‘মনোকালচার’-এর পথ প্রশস্ত করেছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই বৈচিত্র্যময়, কষ্টসহিষ্ণু এবং মুক্ত বীজগুলোর জায়গা দখল করেছে অভিন্ন, ভঙ্গুর এবং পেটেন্ট করা সব জাত।

শিল্পজাত বিচ্ছেদ – খামারের যান্ত্রিকীকরণ
বিংশ শতাব্দী কৃষিকাজের দশ হাজার বছরের রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাস থেকে এক আমূল বিচ্যুতি চিহ্নিত করে। এই যুগে খামার একটি স্বনির্ভর বাস্তুসংস্থান থেকে “জৈবিক কারখানায়” রূপান্তরিত হতে দেখা যায়। এই পরিবর্তনকে প্রায়শই ‘শিল্পজাত বিচ্ছেদ’ (Industrial Rupture) বলা হয়। এটি মূলত যুদ্ধ-পরবর্তী অতিরিক্ত রাসায়নিক অবকাঠামো এবং জেনেটিক্সের প্রতি এক নতুন ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল, যা সহনশীলতা এবং সার্বভৌমত্বের চেয়ে মুনাফা ও অভিন্নতাকে (Uniformity) বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল।
যুদ্ধ-পরবর্তী রাসায়নিক মোড়: যুদ্ধের অস্ত্র কি লাঙলের ফলায়?
শিল্পজাত কৃষির শিকড় প্রোথিত রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে। যুদ্ধের সময় বিস্ফোরকের জন্য নাইট্রেট এবং নার্ভ গ্যাসের জন্য অর্গানোফসফেট তৈরির জন্য বিশাল শিল্প সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শুরু হলো “প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ”।
নাইট্রেট রূপান্তর: যেসব কারখানায় বোমা তৈরি হতো, সেগুলোকেই সিন্থেটিক নাইট্রোজেন সার তৈরির কাজে লাগানো হলো।
কীটনাশকের জয়জয়কার: যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে তৈরি রাসায়নিকগুলোকে পোকামাকড় মারার জন্য “কীটনাশক” এবং আগাছা মারার জন্য “আগাছানাশক” হিসেবে নতুন নামে বাজারজাত করা হলো। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বুঝতে পেরেছিল যে প্রথাগত ও কষ্টসহিষ্ণু বীজগুলোর এই রাসায়নিকের প্রয়োজন নেই। তাই তাদের রাসায়নিক পণ্যের বাজার তৈরি করতে এক নতুন ধরনের বীজের প্রয়োজন ছিল—এমন এক বীজ যা বাইরের উপকরণের ওপর “আসক্ত” থাকবে।
সবুজ বিপ্লব: জীবনের বিনিময়ে ফলন
১৯৬০-এর দশকে মানবতাবাদের ছদ্মবেশে “সবুজ বিপ্লব” শুরু হয়। নরম্যান বোরল্যাগের মতো ব্যক্তিদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে, বিশেষ করে ভারত ও মেক্সিকোতে গম ও ধানের উচ্চ ফলনশীল জাত (HYVs) প্রবর্তন করে। তবে ডঃ বন্দনা শিব যুক্তি দেন যে, “উচ্চ ফলনশীল” শব্দটি এখানে বিভ্রান্তিকর। এই বীজগুলো আসলে “উচ্চ-সড়াসাড়িমূলক” (High-Response) জাত। এগুলো নিজে থেকে উচ্চ ফলন দেয় না; এগুলো কেবল তখনই উচ্চ ফলন দেয় যখন এতে প্রচুর পরিমাণে সিন্থেটিক সার এবং পানি ঢালা হয়।
মাটির স্বাস্থ্যের পতন: সিন্থেটিক সার মাটির জন্য “মাদক” বা ড্রাগের মতো কাজ করে। এগুলো দ্রুত বৃদ্ধি ঘটালেও মাটির অণুজীবজগতকে মেরে ফেলে, যার ফলে একসময়ের উর্বর জমি শেষ পর্যন্ত কেবল গাছ ধরে রাখার একটি বন্ধ্যা মাধ্যমে পরিণত হয়।
পানির সংকট: উচ্চ ফলনশীল বীজে প্রথাগত জাতের তুলনায় দশগুণ বেশি পানির প্রয়োজন হয়। এর ফলে পাঞ্জাবের মতো অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে, যা একসময় ভারতের “শস্যভাণ্ডার” হিসেবে পরিচিত ছিল।
জৈবিক তালা: পুনরুৎপাদন চক্র ভেঙে দেওয়া
কৃষকরা যাতে উৎপাদনকারীর বদলে আজীবন ভোক্তা হয়ে থাকে, তা নিশ্চিত করতে শিল্প জগতকে বীজের পুনরুৎপাদন বন্ধ করার পথ খুঁজে বের করতে হয়েছিল। তারা মূলত দুটি প্রধান পদ্ধতিতে এটি অর্জন করেছে:
১. সংকরায়ন (Hybridization): দুটি ভিন্ন জাতের বীজের মিলনের মাধ্যমে কর্পোরেশনগুলো “F1 হাইব্রিড” তৈরি করে। এই বীজগুলো প্রথম বছরে উচ্চ ফলন দিলেও সেই ফসল থেকে রাখা বীজ (F2 প্রজন্ম) জেনেটিক্যালি অস্থিতিশীল হয়। কৃষক যদি সেগুলো রোপণ করেন, তবে ফলন হবে অনিয়মিত এবং অত্যন্ত কম। এটি কার্যকরভাবে জীববিজ্ঞানের মাধ্যমে বীজ সংরক্ষণকে “বেআইনি” করে দেয় এবং কৃষককে প্রতি বছর বাজারে ফিরে আসতে বাধ্য করে।
[Image showing the process of hybridization and the genetic instability of F2 generation seeds]
২. জেনেটিক ইউজ রেস্ট্রিকশন টেকনোলজি (GURT): যা “টার্মিনেটর প্রযুক্তি” নামে পরিচিত। এটি বীজকে এমনভাবে জিনগতভাবে পরিবর্তন করে যাতে প্রথমবার ফলনের পর বীজগুলো বন্ধ্যা হয়ে যায়। যদিও বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের কারণে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার ঠেকানো সম্ভব হয়েছে, কিন্তু এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট: একটি পুনর্নবীকরণযোগ্য সম্পদকে এককালীন ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা।
বৈচিত্র্যের বিলুপ্তি: মাঠের একফসলী সংস্কৃতি
শিল্প মডেল সর্বদা অভিন্নতা দাবি করে। একই উচ্চতার গাছের জন্য যন্ত্রপাতি তৈরি করা হয় এবং একই জেনেটিক গঠনসম্পন্ন উদ্ভিদের জন্য রাসায়নিক ডিজাইন করা হয়। এর ফলে হাজার হাজার স্থানীয় জাতের বদলে হাতেগোনা কয়েকটি “অলৌকিক” বীজ দখল নেয়।
অভিন্নতার ভঙ্গুরতা: শিল্পজাত একফসলী সংস্কৃতিতে (Monoculture) প্রতিটি উদ্ভিদ অন্যটির জেনেটিক ক্লোন। যদি একটি রোগ বা পোকামাকড় কোনোভাবে একটি গাছের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে ফেলে, তবে তা কয়েক দিনের মধ্যে পুরো ১,০০০ একর জমির ফসল ধ্বংস করে দিতে পারে।
আইরিশ আলু দুর্ভিক্ষের সতর্কবার্তা: বৈচিত্র্যের এই অভাবই আয়ারল্যান্ডে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কারণ ছিল, যেখানে পুরো দেশ ল্যাম্পার (Lumper) নামক আলুর একটি মাত্র জাতের ওপর নির্ভর করত। যখন আলুর মড়ক দেখা দিল, তখন কোনো বিকল্প জেনেটিক পরিকল্পনা ছিল না। বিশ্ব কৃষি ব্যবস্থাকে একফসলী সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দিয়ে আমরা একটি বৈশ্বিক খাদ্য বিপর্যয়ের মঞ্চ তৈরি করছি।
ঋণের ফাঁদ: বিচ্ছেদের সামাজিক মূল্য
শিল্পজাত বীজের দিকে ঝুঁকে পড়া খামারের অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে। প্রথাগত ব্যবস্থায় কৃষকের প্রধান উপকরণ—সূর্য, বৃষ্টি, মাটি এবং সংরক্ষিত বীজ—ছিল বিনামূল্যে। শিল্প ব্যবস্থায় কৃষককে বীজ, সার এবং কীটনাশক ঋণে কিনতে হয়। যখন ফলন ভালো হয় না বা বাজারের দাম কমে যায়, তখন কৃষক এমন এক ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন যা পরিশোধ করা অসম্ভব। এই “রাসায়নিক ঘানি” (Chemical Treadmill) বিশ্বজুড়ে কৃষক আত্মহত্যার এক মর্মান্তিক মহামারী তৈরি করেছে, বিশেষ করে ভারতে, যেখানে ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ৩ লক্ষেরও বেশি কৃষক প্রাণ দিয়েছেন। তাই বীজ সার্বভৌমত্ব কেবল একটি জৈবিক বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের জন্য এক জীবন-মরণ লড়াই।

আইনি বেষ্টনী—জীবনের ভিত্তিকে পেটেন্ট করা
কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে সংকরায়ন এবং রাসায়নিকের মতো জৈবিক “তালাগুলো” ছিল যুদ্ধের অর্ধেক মাত্র। বীজকে একটি সাধারণ ঐতিহ্য থেকে ব্যক্তিগত পণ্যে পুরোপুরি রূপান্তরিত করার জন্য বৈশ্বিক আইনি ব্যবস্থা পুনর্লিখন করার প্রয়োজন ছিল। এই মডেলে আমরা ‘আইনি বেষ্টনী’ (Legal Enclosure) সম্পর্কে জানব—এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে জীবনকে “মেধাসম্পদ” (Intellectual Property) হিসেবে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সৃষ্টির ক্ষমতা প্রকৃতি এবং কৃষকের হাত থেকে সরিয়ে বহুজাতিক কর্পোরেশনের বোর্ডরুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জীবনের নতুন সংজ্ঞা: “প্রকৃতির দান” থেকে “উদ্ভাবন”
ঐতিহাসিকভাবে, পেটেন্ট আইন তৈরি করা হয়েছিল যান্ত্রিক এবং রাসায়নিক উদ্ভাবনের জন্য—যেমন বাষ্পীয় ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক বাল্ব বা কৃত্রিম রং। “প্রকৃতির দান” (Product of Nature) মতবাদের অধীনে জীবন্ত প্রাণীকে পেটেন্ট করার সুযোগ থেকে স্পষ্টভাবে বাদ রাখা হয়েছিল। যুক্তি ছিল সহজ: কোনো মানুষ বীজ, গরু বা ব্যাকটেরিয়া উদ্ভাবন করেনি; তাই কোনো মানুষ এর পেটেন্ট বা মালিকানা দাবি করতে পারে না।
১৯৮০ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী মামলা ‘ডায়মন্ড বনাম চক্রবর্তী’র (Diamond v. Chakrabarty) মাধ্যমে সব বদলে যায়।
মামলাটি ছিল: জেনারেল ইলেকট্রিক-এর বিজ্ঞানী আনন্দ চক্রবর্তী জিনগত প্রকৌশলের মাধ্যমে এমন একটি ব্যাকটেরিয়া তৈরি করেন যা অপরিশোধিত তেল নষ্ট করতে সক্ষম। পেটেন্ট অফিস শুরুতে তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে যুক্তি দেয় যে, অণুজীব হলো জীবন্ত বস্তু এবং এটি পেটেন্টযোগ্য নয়।
রায়: ৫-৪ ভোটের এক সংকীর্ণ ব্যবধানে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, “অণুজীবগুলো জীবিত কি না তা আইনিভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়।” তারা ঘোষণা করেন যে, “সূর্যের নিচে মানুষের তৈরি যেকোনো কিছুই পেটেন্টযোগ্য।” এই রায় আইনি বাঁধ ভেঙে দেয়। এটি বীজকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে নয়, বরং একটি পেটেন্ট করা জেনেটিক সিকোয়েন্সের “সরবরাহ ব্যবস্থা” (Delivery Mechanism) হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।
ট্রিপস (TRIPS) চুক্তি: একাধিপত্যের বিশ্বায়ন
চক্রবর্তী মামলা মার্কিন আইন পরিবর্তন করলেও, ১৯৯৪ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ট্রিপস (TRIPS – Trade-Related Intellectual Property Rights) চুক্তির অধীনে এই যুক্তি পৃথিবীর প্রতিটি জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
অনুচ্ছেদ ২৭.৩ (খ): ট্রিপস-এর এই নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী সকল সদস্য রাষ্ট্রকে উদ্ভিদ জাতের জন্য মেধাসম্পদ সুরক্ষা প্রদান করতে হবে—তা পেটেন্টের মাধ্যমেই হোক বা কোনো “সুই জেনেরিস” (একটি স্বতন্ত্র নিজস্ব পদ্ধতি) ব্যবস্থার মাধ্যমে।
কর্পোরেট স্থপতি: ডঃ বন্দনা শিব প্রায়ই উল্লেখ করেন যে, ট্রিপস কোনো সরকার লেখেনি, বরং বারোটি কর্পোরেশনের একটি জোট (যার মধ্যে মনসান্টো, ডুপন্ট এবং সিনজেনটা অন্তর্ভুক্ত) এটি তৈরি করেছে। তারা একাধারে “রোগী, রোগ নির্ণয়কারী এবং চিকিৎসক” হিসেবে কাজ করেছে; তারা এমন একটি চুক্তি তৈরি করেছে যা তাদের পণ্যের বৈশ্বিক বাজার তৈরির জন্য বীজ সংরক্ষণের প্রাচীন প্রথাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।
বায়োপাইরেসি বা জৈব-দস্যুতা: আদিবাসী জ্ঞানের চুরি
“বায়োপাইরেসি” হলো কর্পোরেশনগুলোর এমন একটি চর্চা যেখানে তারা মেধাসম্পদ আইন ব্যবহার করে এমন সম্পদ এবং জ্ঞানের মালিকানা দাবি করে যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ছিল। ডঃ শিবের আইনি দল বায়োপাইরেসির বেশ কিছু আলোচিত ঘটনার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াই চালিয়েছে: ১. নিম গাছ মামলা: ২,০০০ বছর ধরে ভারতীয়রা নিম গাছকে কীটনাশক এবং ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ১৯৯৪ সালে মার্কিন কোম্পানি ডব্লিউ.আর. গ্রেস নিমের ছত্রাকনাশক নির্যাসের ওপর একটি ইউরোপীয় পেটেন্ট পায়। ডঃ শিব এবং এনজিও-গুলোর একটি জোট দশ বছর ধরে এর বিরুদ্ধে লড়াই করে যুক্তি দেয় যে, এতে কোনো “নতুনত্ব” নেই—এটি প্রাচীন জ্ঞান। ২০০৫ সালে তারা জয়ী হন এবং পেটেন্টটি বাতিল করা হয়। ২. বাসমতী চাল মামলা: ১৯৯৭ সালে রাইসটেক (RiceTec) নামক টেক্সাস-ভিত্তিক একটি কোম্পানিকে “বাসমতী চালের লাইন এবং দানা”র ওপর পেটেন্ট দেওয়া হয়। অথচ হিমালয়ের পাদদেশে হাজার বছর ধরে বাসমতী চাষ হয়ে আসছে। রাইসটেক এটি “উদ্ভাবন” করার দাবি করে ভারত ও পাকিস্তানের কৃষকদের নিজেদের চাল রপ্তানি করতে বাধা দিতে পারত। বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ এবং আইনি চ্যালেঞ্জের পর অধিকাংশ দাবিই বাতিল হয়ে যায়।
শ্মাইজার মামলা: সম্পত্তির অধিকার বনাম জৈবিক বাস্তবতা
আইনি বেষ্টনীর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ হলো ‘মনসান্টো বনাম শ্মাইজার’ (২০০৪) মামলা। পার্সি শ্মাইজার নামে কানাডার এক ক্যানোলা চাষী, যিনি কখনোই মনসান্টোর বীজ কেনেননি, লক্ষ্য করেন যে তার ক্ষেতে “রাউন্ডআপ রেডি” (মনসান্টোর পেটেন্ট করা) ক্যানোলা মিশে গেছে। বীজগুলো প্রতিবেশীর ট্রাক থেকে উড়ে বা বাতাসের মাধ্যমে তার জমিতে এসেছিল। নিজের অর্গানিক ফসলের এই দূষণের জন্য ক্ষমা চাওয়ার বদলে, মনসান্টো তার বিরুদ্ধে “পেটেন্ট লঙ্ঘনের” মামলা করে। কানাডার সুপ্রিম কোর্ট মনসান্টোর পক্ষেই রায় দেয়। তাদের যুক্তি ছিল বিধ্বংসী: বীজগুলো কীভাবে সেখানে এসেছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেহেতু শ্মাইজারের ফসলে মনসান্টোর পেটেন্ট করা জিন ছিল, তাই টেকনিক্যালি তিনি তাদের সম্পত্তি “দখলে” রেখেছেন। এই রায় প্রতিষ্ঠিত করে যে, কর্পোরেট সম্পত্তির অধিকার পরাগায়নের জৈবিক বাস্তবতা এবং কৃষকের অধিকারের চেয়ে বড়।
ভবিষ্যতের বেষ্টনী
বীজকে “মেধাসম্পদ” বানানোর মাধ্যমে কর্পোরেশনগুলো যা অর্জন করেছে তা সামন্ত প্রভুরা কেবল স্বপ্নেই দেখতে পারতেন: তারা জীবনের উৎসকেই বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে ফেলেছে।
অপরাধীকরণ: অনেক দেশে পেটেন্টহীন বা প্রথাগত বীজের আদান-প্রদানকে এখন এমনভাবে “নিয়ন্ত্রণ” করা হচ্ছে যেন তা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে।
জীবনের ডেটা-মাইনিং: আজ এই বেষ্টনী “ডিজিটাল সিকোয়েন্স ইনফরমেশন” (DSI)-এর দিকে এগোচ্ছে। এখানে কর্পোরেশনগুলো বীজের ডিএনএ সিকোয়েন্স করে ডিজিটাল কোড পেটেন্ট করছে। এর ফলে ভৌত বা আসল বীজ ছাড়াই তারা আমাদের গ্রহের জৈবিক ব্লু-প্রিন্টের মালিকানা পেয়ে যাচ্ছে।

“মনের একফসলী সংস্কৃতি”—দার্শনিক লড়াই
বীজ আদান-প্রদানের জগত থেকে কর্পোরেট পেটেন্টের জগতে এই রূপান্তর হঠাৎ করে ঘটেনি। এর মূলে ছিল প্রকৃতি, জ্ঞান এবং বুদ্ধিমত্তাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে এক গভীর পরিবর্তন। ডঃ বন্দনা শিব একে “মনের একফসলী সংস্কৃতি” (Monocultures of the Mind) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই মডেলে আমরা শিল্পায়নের যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বীজ সার্বভৌমত্বের জৈবিক ও সামগ্রিক (Holistic) দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যকার দার্শনিক লড়াই নিয়ে আলোচনা করব।
যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি: প্রকৃতি যখন একটি মেশিন
বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এবং রেনেসাঁ পরবর্তী সময় থেকে পশ্চিমা বিজ্ঞান বিশ্বকে ক্রমবর্ধমানভাবে একটি “যান্ত্রিক” লেন্স দিয়ে দেখে আসছে। এই ধারণায় প্রকৃতি কোনো জীবন্ত বা স্ব-সংগঠিত ব্যবস্থা নয়; বরং এটি জড় অংশ দিয়ে তৈরি একটি মেশিন, যাকে মানুষের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন করা যায়।
সংকীর্ণতার বিভ্রান্তি (The Reductionist Fallacy): এই মতবাদ অনুসারে কোনো ব্যবস্থাকে বুঝতে হলে তাকে ক্ষুদ্রতম অংশে বিভক্ত করতে হয়। কৃষির ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ ঘটালে দেখা যায়—একটি বনকে কেবল “কাঠ” হিসেবে, একটি খামারকে “খাদ্য কারখানা” হিসেবে এবং একটি বীজকে জেনেটিক কোড বহনকারী একটি “সরবরাহ ব্যবস্থা” হিসেবে দেখা হয়।
প্রাণের অস্তিত্ব অস্বীকার: বীজকে মেশিন হিসেবে বিবেচনা করার মাধ্যমে আমরা এর সহজাত “সত্তা”—অর্থাৎ এর বিবর্তন, অভিযোজন এবং পুনরুৎপাদনের ক্ষমতাকে অস্বীকার করি। যান্ত্রিক দৃষ্টিতে বীজ কেবল তখনই “সক্রিয়” হয় যখন গবেষণাগারে একজন বিজ্ঞানী একে নিয়ে কাজ করেন, তার আগে এটি নিছক একটি “নিষ্ক্রিয়” বস্তু।
“মনের একফসলী সংস্কৃতি”র সংজ্ঞা
ডঃ শিবের মতে, “মনের একফসলী সংস্কৃতি” এমন এক অবস্থা যেখানে একটি একক ও প্রভাবশালী চিন্তাধারাকে প্রতিষ্ঠিত করতে মানুষের অর্জিত জ্ঞানের বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করা হয়।
স্থানীয় জ্ঞানের বিনাশ: আদিবাসী এবং প্রথাগত কৃষি জ্ঞান—যা প্রায়শই নারীদের হাতে সংরক্ষিত থাকে—তাকে “আদিম” বা “অৈজ্ঞানিক” বলে খারিজ করা হয়। কারণ এই জ্ঞানকে শিল্পজাত মাপকাঠিতে পরিমাপ করা যায় না।
সর্বজনীন সত্যের বিভ্রম: শিল্পজাত বিজ্ঞান দাবি করে যে তাদের পদ্ধতিগুলো “সর্বজনীন”। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো প্রায়শই কেবল গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের জন্য কার্যকর। একটি বীজ যা রাসায়নিক-নির্ভর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ভালো ফলন দেয়, তা বাস্তব মাঠের জটিল ও খামখেয়ালি পরিবেশে প্রায়ই ব্যর্থ হয়।
ফলাফল দেখেও না দেখা: যখন আমরা কেবল একটি চলকের (যেমন “ফলন”) ওপর নজর দিই, তখন আমরা এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা “এক্সটারনালিটি” সম্পর্কে অন্ধ হয়ে যাই—যেমন মাটির স্বাস্থ্যের বিনাশ, পানির বিষাক্ততা এবং গ্রামীণ সমাজের পতন।
বীজের পিতৃতন্ত্র (The Patriarchy of the Seed)
বীজ সার্বভৌমত্ব একইসাথে একটি নারীবাদী লড়াই। অধিকাংশ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে নারীরাই ছিলেন বীজের প্রধান রক্ষক। তারা রান্নাঘরের বাগানের জীববৈচিত্র্য এবং দীর্ঘমেয়াদী শস্য সংরক্ষণের বিষয়টি তদারকি করতেন।
ক্ষমতার পালাবদল: বীজের শিল্পায়ন জ্ঞানের কেন্দ্রকে ঘর এবং মাঠ (নারীদের ক্ষেত্র) থেকে সরিয়ে গবেষণাগার এবং বোর্ডরুমে (ঐতিহাসিকভাবে পুরুষদের ক্ষেত্র) নিয়ে গেছে।
যৌথ যত্নের অবমূল্যায়ন: জৈবিক বা অর্গানিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে মাটির প্রতি “যত্ন” এবং “মমতা”র ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে, শিল্পায়ন মডেল গড়ে উঠেছে প্রকৃতির ওপর “নিয়ন্ত্রণ” এবং “আধিপত্য” বিস্তারের মাধ্যমে। বীজ পুনরুদ্ধার করা মানেই হলো জীবন ধারণের “নারীসুলভ” বা মমতাময় নীতিকে পুনরুদ্ধার করা।
জ্ঞানের সার্বভৌমত্ব: “আদিবাসী বিজ্ঞান” পুনরুদ্ধার
বীজ সার্বভৌমত্ব আন্দোলন দাবি করে যে “বিজ্ঞান” কেবল একটি নয়। বরং পৃথিবীতে “জ্ঞানের জীববৈচিত্র্য” (Biodiversity of Knowledge) বিদ্যমান।
বিজ্ঞানী-কৃষক: একজন কৃষক যিনি জানেন ধানের কোন জাতটি নোনা পানির প্লাবনে টিকে থাকতে পারে কিংবা কোন শিম গাছটি নির্দিষ্ট পোকা প্রতিরোধ করতে পারে—তিনিও একজন বিজ্ঞানী। তার গবেষণাগার হলো মাঠ এবং তার “পিয়ার-রিভিউ” বা মূল্যায়ন পদ্ধতি হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তার সম্প্রদায়ের টিকে থাকা।
বৌদ্ধিক ন্যায়বিচার (Cognitive Justice): বীজ সার্বভৌমত্ব “বৌদ্ধিক ন্যায়বিচার” দাবি করে—অর্থাৎ প্রথাগত জ্ঞান যে পশ্চিমা গবেষণাগার-ভিত্তিক বিজ্ঞানের মতোই কার্যকর এবং “বৈজ্ঞানিক”, তার স্বীকৃতি প্রদান। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এই প্রথাগত জ্ঞান প্রায়শই বেশি টেকসই বলে প্রমাণিত হচ্ছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির পথ
“মনের বেষ্টনী” হলো “বীজের বেষ্টনী” তৈরির প্রথম ধাপ। বীজের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে হলে আমাদের প্রথমে মন থেকে এই বিশ্বাসগুলো দূর করতে হবে যে:
বৈচিত্র্য মানেই “অদক্ষতা”।
অভিন্নতা মানেই “প্রগতি”।
জীবনকে একটি কর্পোরেশন “উদ্ভাবন” করতে পারে এবং তার “মালিক” হতে পারে।
যখন আমরা এই “জৈবিক বা অর্গানিক দৃষ্টিভঙ্গি” পুনরুদ্ধার করব, তখন আমরা বীজকে কেবল শোষণের পণ্য হিসেবে নয়, বরং একজন শিক্ষক এবং টেকসই ভবিষ্যতের সেতু হিসেবে দেখতে পাব। মডিউল ৫-এ আমরা দেখব কীভাবে এই দর্শনকে কমিউনিটি সিড ব্যাংক বা সামাজিক বীজ ব্যাংক তৈরির মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া হচ্ছে।

নবধান্য মডেল এবং কমিউনিটি সিড ব্যাংক (সামাজিক বীজ ব্যাংক)
আগের মডিউলগুলোতে বর্ণিত আইনি লড়াইগুলো আদালত বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্মেলনের নিরস পরিবেশে চললেও, বীজ সার্বভৌমত্ব আন্দোলনের আসল হৃদস্পন্দন স্পন্দিত হয় মাটির গভীরে। শিল্পজাত বীজ একচেটিয়াকরণের ক্রমবর্ধমান হুমকির মোকাবিলায় ১৯৮৭ সালে ডঃ বন্দনা শিব ‘নবধান্য’ (যার অর্থ “নয়টি বীজ” বা “নতুন উপহার”) প্রতিষ্ঠা করেন। এই ব্যবহারিক প্রতিরোধের মূল ভিত্তি হলো কমিউনিটি সিড ব্যাংক বা সামাজিক বীজ ব্যাংক।
এই মডিউলে আমরা বীজ ব্যাংক মডেলের কার্যপদ্ধতি, এর বিজ্ঞান এবং সামাজিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব। এটি মূলত জৈবিক বুদ্ধিমত্তার এক জীবন্ত গ্রন্থাগার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সম্মুখ সারির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ইন-সিটু বনাম এক্স-সিটু: কেন জীবন্ত বীজ গুরুত্বপূর্ণ?
নবধান্য মডেলটি বুঝতে হলে নরওয়ের বিখ্যাত ‘স্বালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট’-এর মতো “ডুমসডে ভল্ট” (কেয়ামত দিবসের ভাণ্ডার) মডেল থেকে এর পার্থক্য বুঝতে হবে।
এক্স-সিটু সংরক্ষণ (ভল্ট বা ভাণ্ডার): স্বালবার্ডে বীজগুলোকে পাহাড়ের গভীরে বরফ জমাট অবস্থায় রাখা হয় যাতে কোনো বড় বিপর্যয়ে সেগুলো রক্ষা পায়। ব্যাকআপ হিসেবে এটি মূল্যবান হলেও, এই বীজগুলো আসলে “সময়ের মধ্যে জমে” থাকে। তারা বাড়ে না, মাটির সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না এবং খাপ খাইয়ে নিতে শেখে না।
ইন-সিটু সংরক্ষণ (জীবন্ত ব্যাংক): কমিউনিটি সিড ব্যাংক বীজকে কৃষকের হাতে রাখে। যেহেতু বীজ একটি জীবন্ত সত্তা, তাই একে নিয়মিত রোপণ, বড় করা এবং সংগ্রহ করতে হয়। এটি বীজকে পরিবর্তিত বৃষ্টিপাত, নতুন কীটপতঙ্গ এবং বাড়তে থাকা তাপমাত্রার সাথে সহ-বিবর্তিত (Co-evolve) হতে সাহায্য করে। এই উষ্ণায়নের পৃথিবীতে ৪০ বছর আগে জমে যাওয়া একটি বীজ হয়তো বরফ গলালে আজকের পরিবেশে “জেনেটিক্যালি অচল” প্রমাণিত হতে পারে। কিন্তু যে বীজ গত ৪০ বছর ধরে প্রতি বছর চাষ হচ্ছে, সে শিখে নিয়েছে কীভাবে টিকে থাকতে হয়।
কমিউনিটি সিড ব্যাংকের কার্যপদ্ধতি
একটি সামাজিক বীজ ব্যাংক কেবল একটি গুদাম ঘর নয়; এটি একটি সামাজিক ও জৈবিক প্রতিষ্ঠান। নবধান্য ভারতজুড়ে ১৫০টিরও বেশি এমন ব্যাংক স্থাপন করেছে এবং এই মডেলটি এখন বিশ্বজুড়ে অনুসৃত হচ্ছে।
১. সংগ্রহ পর্যায়: কৃষক এবং গবেষকরা প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে “ল্যান্ডরেস” বা প্রথাগত জাতগুলো খুঁজে বের করেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালিত হয়েছে। তারা এমন বীজ খোঁজেন যার বিশেষ কিছু “গুণ” আছে, যেমন—গভীর মূল, ঔষধি গুণ বা সুগন্ধ। ২. গুণন পর্যায় (Multiplication): এই বীজগুলো “সংরক্ষণ প্লটে” রোপণ করা হয়। এই প্লটগুলো সম্পূর্ণ জৈব বা অর্গানিক, যা নিশ্চিত করে যে বীজগুলো যেন রাসায়নিকের দ্বারা “আদুরে” হয়ে না ওঠে। এটি বীজের সহজাত শক্তি এবং সহনশীলতা পরীক্ষা করে। ৩. বিনিময় পর্যায়: এটিই হলো বাস্তবে “বীজ স্বরাজ”। এই ব্যাংক বীজ বিক্রি করে না। এর বদলে এটি একটি ‘নন-মনিটারি এক্সচেঞ্জ’ বা অর্থহীন বিনিময়ের মাধ্যমে কাজ করে। একজন কৃষক নির্দিষ্ট পরিমাণ দেশীয় ধানের বীজ “ধার” নেন এবং ফসল কাটার পর তার দ্বিগুণ পরিমাণ বীজ ব্যাংকে ফেরত দেন। এটি নিশ্চিত করে যে কোনো নগদ টাকা বা ঋণ ছাড়াই সম্প্রদায়ের “জৈবিক মূলধন” প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সহনশীলতার প্রজনন: টিকে থাকার বিজ্ঞান
শিল্পজাত বীজ তৈরি করা হয় একটি “সুরক্ষিত” পরিবেশের জন্য—যেখানে মানুষ পানি এবং রাসায়নিকের নিশ্চয়তা দেয়। অন্যদিকে নবধান্যের বীজ তৈরি হয় পরিবর্তিত পৃথিবীর “অরক্ষিত” বাস্তবতার সাথে লড়াই করার জন্য।
বন্যা-সহনশীল জাত: উড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রেক্ষাপটে নবধান্য “বালু” এবং “ভুণ্ডি” ধানের জাত সংরক্ষণ করেছে, যা কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্যার পানির নিচে ডুবে থাকলেও নষ্ট হয় না এবং ফলন দেয়।
লবণ-সহনশীল জাত: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে নোনা পানি উপকূলীয় খামারগুলোকে ধ্বংস করছে। ঐতিহ্যবাহী “কালা” ধানের জাত নোনা মাটিতে চমৎকারভাবে বেড়ে ওঠে, যা উপকূলীয় মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খরা-প্রতিরোধী শস্য: মিলেট (কাউন/জোয়ার/বাজরা) এবং প্রাচীন গমের জাতগুলো পুনরায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে কারণ এদের মূল অনেক গভীর পর্যন্ত যেতে পারে, যা শুষ্ক মাটিতেও পানি খুঁজে নেয়। এরাই হলো একবিংশ শতাব্দীর “জলবায়ু বীর”।
নারীদের ভূমিকা: ঠাকুমা-দিদিমাদের বিজ্ঞান
নবধান্য মডেলে নারীরাই প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। ঐতিহাসিকভাবে নারীরাই রান্নাঘর এবং মাঠের রক্ষক ছিলেন। তারা জানেন কোন জাতের চাল সহজে গুঁড়ো করা যায়, কোনটি খেলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে এবং কোনটি গুদামে রাখলে পোকা ধরে না। বীজ ব্যাংকের দায়িত্ব নারীদের হাতে দিয়ে এই আন্দোলন নিশ্চিত করে যে, “বিঘাপ্রতি ফলন”-এর চেয়ে ‘পুষ্টির সার্বভৌমত্ব’ যেন অগ্রাধিকার পায়। এটি সম্প্রদায়ের প্রধান “বিজ্ঞানী” হিসেবে নারীদের সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করে।
বীজ ব্যাংক থেকে বীজ স্বাধীনতা অঞ্চল
নবধান্য মডেলের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ‘বীজ স্বাধীনতা অঞ্চল’ (Seed Freedom Zones) তৈরি করা। এগুলো হলো এমন গ্রাম বা অঞ্চল যারা নিজেদের পেটেন্ট করা বীজ এবং রাসায়নিক সার থেকে মুক্ত ঘোষণা করেছে।
বাস্তুসংস্থানিক নিরাপত্তা: এই অঞ্চলগুলো “বায়ো-হটস্পট” হয়ে ওঠে যেখানে পাখি, মৌমাছি এবং উপকারী পতঙ্গরা ফিরে আসে, যা কীটনাশকের কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করে।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: নিজস্ব বীজ এবং সার (কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট) তৈরির মাধ্যমে এই অঞ্চলের কৃষকরা ঋণমুক্ত থাকেন। কাগজে-কলমে শিল্পজাত খামারের তুলনায় তাদের “মুনাফা” কম মনে হতে পারে, কিন্তু তাদের প্রকৃত নিট আয় অনেক বেশি কারণ তাদের উৎপাদন খরচ শূন্যের কাছাকাছি।

ঋণের অর্থনীতি এবং আশার সত্যাগ্রহ
বীজ সার্বভৌমত্বের লড়াইকে প্রায়শই একটি জৈবিক বা পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু এর মূলে রয়েছে একটি লুটেরা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। বীজকে নিয়ন্ত্রণ করা মানে হলো বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থার “ঋণ-তোরণ” (Debt-gate) নিয়ন্ত্রণ করা। এই মডিউলে আমরা শিল্পায়িত কৃষির গাণিতিক বাস্তবতা, “ঋণ-বীজ-রাসায়নিক” ঘানির মর্মান্তিক পরিণতি এবং ‘বীজ সত্যাগ্রহের’ বিপ্লবী অহিংসা নিয়ে আলোচনা করব।
ঋণের ফাঁদের ব্যবচ্ছেদ
প্রথাগত কৃষি মডেলে একজন কৃষকের প্রধান উপকরণগুলো ছিল প্রকৃতির দান, যাকে ডঃ শিব বলেন “Gifts of Nature”: রোদ, বৃষ্টি, কম্পোস্ট থেকে পাওয়া মাটির উর্বরতা এবং আগের বছরের ফসল থেকে রাখা বীজ। এই “বৃত্তাকার অর্থনীতিতে” উৎপাদন খরচ ছিল প্রায় শূন্য।
শিল্পায়ন মডেল কৃষককে একজন ‘ভোক্তা’তে রূপান্তরিত করেছে। আধুনিক বাজারে টিকে থাকতে হলে একজন কৃষককে বাধ্য হয়ে কিনতে হয়:
- পেটেন্ট করা বীজ: যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং আইনি বা জৈবিকভাবে সংরক্ষণ করা যায় না।
- সিন্থেটিক সার: কারণ শিল্পজাত বীজগুলো উচ্চ মাত্রার নাইট্রোজেনের ওপর “আসক্ত”।
- কীটনাশক ও আগাছানাশক: কারণ একফসলী চাষে (Monoculture) বৈচিত্র্যময় বাস্তুসংস্থানের মতো প্রাকৃতিক ভারসাম্য থাকে না।
যেহেতু এই উপকরণগুলোর জন্য প্রচুর পুঁজির প্রয়োজন হয়, তাই কৃষককে ঋণ নিতে হয়—প্রায়ই চড়া সুদে মহাজন বা কর্পোরেট-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে। যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফসল নষ্ট হয় বা বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমে যায়, তখন কৃষক এমন এক ঋণের জালে আটকা পড়েন যা পরিশোধ করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
কৃষক আত্মহত্যার মহামারী
এই অর্থনৈতিক কাঠামো একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে। শুধুমাত্র ভারতেই ১৯৯৫ সাল থেকে ৩ লক্ষাধিক কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। এই মহামারী মূলত “তুলা বলয়” (Cotton Belt) অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি, যেখানে বিটি কটন (মনসান্টোর জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত জাত) সবচেয়ে আগ্রাসীভাবে প্রবর্তন করা হয়েছিল।
“আত্মঘাতী বীজের” ট্র্যাজেডি নিহিত আছে কৃষকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বা ‘এজেন্সি’ হারিয়ে ফেলার মধ্যে। যখন একজন কৃষক বীজ সংরক্ষণের অধিকার হারান, তখন তিনি তার স্বায়ত্তশাসন হারান। ডঃ শিব উল্লেখ করেন যে এগুলো কেবল “আত্মহত্যা” নয়—এগুলো হলো “কর্পোরেট হত্যাকাণ্ড”, যা এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফল যা মানুষের জীবনের চেয়ে পেটেন্ট কার্যকর করাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
প্রকৃত ব্যয় হিসাব (True Cost Accounting): “সস্তা খাদ্যের” মিথ বা রূপকথা
শিল্পায়িত কৃষি দাবি করে তারা “দক্ষ”, কারণ তারা কম বাজারে দামে বিপুল পরিমাণ একক শস্য উৎপাদন করে। তবে বীজ সার্বভৌমত্বের প্রবক্তারা ‘ট্রু কস্ট অ্যাকাউন্টিং’ ব্যবহার করে দেখিয়েছেন যে, শিল্পজাত খাবার আসলে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল খাবার।
- পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (Externalities): শিল্পজাত শস্যের “কম দামের” মধ্যে কীটনাশক-দূষিত ভূগর্ভস্থ পানি পরিষ্কার করার খরচ, কৃষক সম্প্রদায়ের ক্যান্সার চিকিৎসা, কিংবা পরাগায়নকারী পতঙ্গরা মারা যাওয়ার ফলে বাস্তুসংস্থান হারানো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত থাকে না।
- বৈচিত্র্যের উৎপাদনশীলতা: নবধান্যের গবেষণা দেখায় যে, জৈব ও বৈচিত্র্যময় খামারগুলো শিল্পজাত একফসলী খামারের চেয়ে একর প্রতি অনেক বেশি পুষ্টি উৎপাদন করে। একটি শিল্পজাত খামার হয়তো বেশি পরিমাণে “স্টার্চ বা শ্বেতসার” উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু একটি সার্বভৌম খামার প্রোটিন, খনিজ এবং ভিটামিনের সুষম খাদ্য তৈরি করে, যা জাতির স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি লাভজনক।
বীজ সত্যাগ্রহ: জীবনের জন্য আইন অমান্য
এই অর্থনৈতিক সহিংসতার মুখে ডঃ শিব শুরু করেন ‘বীজ সত্যাগ্রহ’। এই শব্দটি মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ (সত্যের শক্তি) থেকে নেওয়া। ব্রিটিশদের লবণ করের প্রতিবাদে গান্ধী যেভাবে সমুদ্র অভিমুখে পদযাত্রা করেছিলেন—যুক্তি দিয়েছিলেন যে লবণ প্রকৃতির দান এবং এতে কর বসানো যায় না—বীজ সত্যাগ্রহও ঠিক তেমনি ঘোষণা করে যে, বীজ প্রকৃতির দান এবং এটি পেটেন্ট করা যায় না।
বীজ সত্যাগ্রহের মূলনীতি: ১. অসহযোগ: কৃষকরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে তারা এমন কোনো আইন মানবেন না যা বীজ সংরক্ষণকে অপরাধ গণ্য করে। যখন আইন পৃথিবী এবং দরিদ্রদের প্রতি “সহজাতভাবে সহিংস”, তখন সেটি ভেঙে ফেলা নৈতিক দায়িত্ব। ২. প্রতিরোধ হিসেবে বীজ বিনিময়: প্রতিবেশীর সাথে বীজ বিনিময় করার কাজ একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়। এটি জীবনের মূল্য নির্ধারণে বাজারকে অস্বীকার করার এক পদক্ষেপ। ৩. জিএমও-মুক্ত অঞ্চল: পুরো সম্প্রদায় তাদের জমিকে “সার্বভৌম অঞ্চল” হিসেবে ঘোষণা করে, যেখানে কর্পোরেট পেটেন্ট এবং জেনেটিক্যালি পরিবর্তিত প্রাণীর প্রবেশ নিষিদ্ধ।
অভাব থেকে প্রাচুর্য
শিল্পায়ন মডেল পেটেন্ট করা জীবনের “কৃত্রিম অভাবের” ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে বীজ সার্বভৌমত্ব দাঁড়িয়ে আছে জীবন্ত বীজের “প্রাকৃতিক প্রাচুর্যের” ওপর। ঋণের চক্র ভেঙে ফেলার মাধ্যমে বীজ সত্যাগ্রহ কৃষকের মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়। এটি কৃষির লক্ষ্যকে “ঋণ শোধ” থেকে সরিয়ে “সম্প্রদায়ের পুষ্টি যোগানো”তে রূপান্তরিত করে।

বৈশ্বিক রণক্ষেত্র—আন্তর্জাতিক চুক্তি ও অধিকার
কৃষকরা যখন মাটিতে থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, ঠিক তখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাঁচঘেরা সদর দপ্তরে এক সমান্তরাল এবং সমপরিমাণ তীব্র লড়াই চলে। এটিই হলো “বৈশ্বিক রণক্ষেত্র”, যেখানে এমন সব আইনি কাঠামো নিয়ে বিতর্ক হয় যা হয় জীবনের ওপর কর্পোরেট আধিপত্যকে বৈধতা দেবে, না হয় কৃষকদের প্রাচীন অধিকারগুলোকে রক্ষা করবে। এই মডিউলে আমরা “উদ্ভিদ প্রজননকারীর অধিকার” (কর্পোরেট স্বার্থ) এবং “কৃষকের অধিকারের” (সার্বভৌমত্ব) মধ্যকার সংঘাত এবং বিশ্বব্যাপী জেনেটিক সম্পদ পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করব।
দুই বিশ্বের দ্বন্দ্ব: UPOV বনাম সিড ট্রিটি (বীজ চুক্তি)
আন্তর্জাতিক আইনি অঙ্গনে দুটি প্রাথমিক কাঠামো আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। তারা বীজ আসলে কী এবং এর মালিক কে—এই বিষয়ে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে।
১. UPOV 91 (কর্পোরেট গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড): ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য প্রোটেকশন অফ নিউ ভ্যারাইটিজ অফ প্ল্যান্টস’ (UPOV), বিশেষ করে এর ১৯৯১ সালের আইনটি “উদ্ভিদ প্রজননকারীদের” সুরক্ষার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। UPOV-এর অধীনে সুরক্ষার যোগ্য হতে হলে একটি বীজকে অবশ্যই DUS মানদণ্ড পূরণ করতে হবে: এটি হতে হবে স্বতন্ত্র (Distinct), অভিন্ন (Uniform) এবং স্থিতিশীল (Stable)।
অভিন্নতার ফাঁদ: ঐতিহ্যবাহী ল্যান্ডরেস বা দেশীয় জাতগুলো UPOV থেকে বাদ পড়ে কারণ সেগুলো বৈচিত্র্যময় এবং বিবর্তনশীল—তারা ‘অভিন্ন’ নয়। সুরক্ষার জন্য “অভিন্নতা”কে আইনি শর্ত হিসেবে আরোপ করে UPOV কার্যকরভাবে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়।
বিনিময়কে অপরাধীকরণ: UPOV 91 কৃষকের বিশেষ সুবিধাকে কঠোরভাবে সীমিত করে। এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী অনেক দেশে কৃষকের জন্য কোনো সংরক্ষিত জাতের বীজ বিক্রি করা এমনকি প্রতিবেশীর সাথে বিনিময় করাও অবৈধ।
২. সিড ট্রিটি (ITPGRFA – জনগণের ঢাল): আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ‘খাদ্য ও কৃষির জন্য উদ্ভিদ জেনেটিক সম্পদের আন্তর্জাতিক চুক্তি’ নামে পরিচিত। ২০০৪ সালের এই চুক্তিটি বীজ সার্বভৌমত্ব আন্দোলনের জন্য একটি কষ্টার্জিত বিজয় ছিল। এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক আইনত বাধ্যতামূলক দলিল যা ‘কৃষকের অধিকার’ (অনুচ্ছেদ ৯) স্বীকৃতি দেয়।
গ্লোবাল কমনস (বৈশ্বিক সর্বজনীন সম্পদ): এই চুক্তি বিশ্বের ৬৪টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য শস্যের জন্য একটি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে, যা নিশ্চিত করে যে এগুলো গবেষণা ও প্রজননের জন্য সর্বজনীন মালিকানায় (Public Domain) থাকবে।
কৃষকের অধিকারের সংজ্ঞা: চারটি স্তম্ভ
বীজ সার্বভৌমত্বের জন্য অপরিহার্য চারটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকারের রূপরেখা এই চুক্তিতে দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রিপস (TRIPS)-এর মতো বাণিজ্য চুক্তিগুলো প্রায়ই এই অধিকারগুলোকে খর্ব করে।
প্রথাগত জ্ঞানের সুরক্ষা: আদিবাসী কৃষকের “বিজ্ঞান” যে গবেষণাগারের বিজ্ঞানীর মতোই মূল্যবান, তা স্বীকার করা।
ন্যায্য সুবিধা ভাগ করে নেওয়া: যদি কোনো কর্পোরেশন একটি প্রথাগত বীজ ব্যবহার করে নতুন বাণিজ্যিক জাত তৈরি করে, তবে যে সম্প্রদায় মূলত সেই বীজটি লালন-পালন করেছে, তাদের লাভের অংশ দিতে হবে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বীজ আইন প্রণয়নের সময় কৃষকদের অবশ্যই আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে।
সংরক্ষণ, ব্যবহার, বিনিময় এবং বিক্রির অধিকার: এটিই হলো বীজ স্বরাজের মূল কথা। তবে চুক্তিতে একটি ফাঁক রয়েছে যা এই অধিকারকে “জাতীয় আইনের অধীন” করে দেয়, যা প্রায়শই কর্পোরেট-শাসিত UPOV নিয়মের দিকেই মোড় নেয়।
WIPO লড়াই: ডিজিটাল বায়োপাইরেসি (DSI)
বৈশ্বিক রণক্ষেত্রের নতুন সীমান্ত হলো ডিজিটাল সিকোয়েন্স ইনফরমেশন (DSI)। কর্পোরেশনগুলো এখন প্রথাগত বীজের ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করছে এবং সেগুলো ডিজিটাল ডেটাবেসে আপলোড করছে।
সিন্থেটিক বায়োপাইরেসি: বীজের “ডিজিটাল কোড” পেটেন্ট করার মাধ্যমে একটি কোম্পানি আসল বীজ স্পর্শ না করেই ল্যাবে সিন্থেটিক বায়োলজির মাধ্যমে উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্যগুলো পুনরায় তৈরি করতে পারে।
আইনি ফাঁকফোকর: যেহেতু বর্তমান চুক্তিগুলো (যেমন নাগায়া প্রোটোকল) জৈবিক উপাদানের ভৌত বা শারীরিক ব্যবহারের ওপর আলোকপাত করে, তাই ডিজিটাল সিকোয়েন্সগুলো একটি “আইনি ধূসর এলাকায়” রয়ে গেছে। এর ফলে কর্পোরেশনগুলো লভ্যাংশ প্রদানের শর্তগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
কৃষক অধিকারের জাতিসংঘ ঘোষণা (UNDROP)
২০১৮ সালে জাতিসংঘ UNDROP গ্রহণ করে, যা একটি যুগান্তকারী ঘোষণা হিসেবে বীজ সার্বভৌমত্বকে মানবাধিকার হিসেবে সুসংহত করে।
অনুচ্ছেদ ১৯: স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে “কৃষক এবং গ্রামীণ এলাকায় কর্মরত অন্যান্য মানুষের বীজের ওপর অধিকার রয়েছে,” যার মধ্যে প্রথাগত জ্ঞান রক্ষা এবং নিজস্ব বীজ ব্যবস্থা বজায় রাখার অধিকার অন্তর্ভুক্ত।
যুক্তির পরিবর্তন: এটি বিতর্ককে “সম্পত্তি আইন” থেকে “মানবাধিকার আইনে” স্থানান্তরিত করে। এটি যুক্তি দেয় যে বীজের অধিকার হলো ‘খাদ্যের অধিকারের’ পূর্বশর্ত, এবং তাই কর্পোরেট পেটেন্ট একে অগ্রাহ্য করতে পারে না।
বৈশ্বিক সর্বজনীন সম্পদ পুনরুদ্ধার
বৈশ্বিক রণক্ষেত্রটি বর্তমানে এক অচলাবস্থায় রয়েছে। কর্পোরেশনগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে UPOV 91 চাপিয়ে দেওয়ার জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তি (FTA) ব্যবহার করে। অন্যদিকে, বীজ সার্বভৌমত্ব আন্দোলন জাতিসংঘ এবং সিড ট্রিটি ব্যবহার করে একটি “গ্লোবাল কমনস” বা বৈশ্বিক সর্বজনীন সম্পদ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। খাদ্যের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কোন আইনি যুক্তি জয়ী হবে তার ওপর: বাজারের যুক্তি নাকি জীবনের যুক্তি।

ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধার—পৃথিবীর নাগরিকত্ব
বীজ সার্বভৌমত্বের লড়াই কৃষি উপকরণ বা পেটেন্ট আইন নিয়ে কোনো যান্ত্রিক বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি গভীর; এটি একটি বৈশ্বিক আন্দোলনের অগ্রভাগ যা একটি “জীবন্ত” সমাজ বলতে কী বোঝায় তা সংজ্ঞায়িত করে। এই চূড়ান্ত মডিউলে আমরা একটি কর্পোরেট খাদ্য শৃঙ্খলের ‘ভোক্তা’ হওয়া থেকে ‘পৃথিবীর নাগরিক’ (Earth Citizen) হয়ে ওঠার রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করব এবং এমন একটি ভবিষ্যতের রূপরেখা দেখব যেখানে জীবন আবারও নিজেকে নবায়ন করার স্বাধীনতা পাবে।
খাদ্য ভোক্তা থেকে পৃথিবীর নাগরিক
শিল্পায়ন মডেল কয়েক দশক ধরে আমাদের কেবল “ভোক্তা” হতে শিখিয়েছে—যারা একটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের নিষ্ক্রিয় প্রান্তবিন্দু মাত্র। এই ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য, পরিবেশ বা ন্যায়ের চেয়ে কম দাম এবং সারা বছর সব খাবারের প্রাপ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বীজ সার্বভৌমত্ব আমাদের এই পরিচয় ঝেড়ে ফেলে ‘পৃথিবীর নাগরিকত্ব’ গ্রহণ করার আহ্বান জানায়।
- পারস্পরিক সংযোগ (Interconnectedness): একজন পৃথিবীর নাগরিক বুঝতে পারেন যে খাবারের প্রতিটি লোকমা একটি রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত কর্মকাণ্ড। যদি বীজের ওপর পেটেন্ট থাকে এবং মাটি বিষাক্ত হয়, তবে সেই খাবার কখনোই প্রকৃত পুষ্টি দিতে পারে না।
- দায়িত্বশীলতা: সার্বভৌমত্ব কেবল একটি অধিকার নয়; এটি আমাদের টিকিয়ে রাখা জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করার একটি দায়িত্বও বটে। এর অর্থ হলো স্থানীয় বীজ ব্যাংকগুলোকে সমর্থন করা, জিএমও (GMO) লেবেলিং দাবি করা এবং “মনের একফসলী সংস্কৃতি” প্রতিরোধ করা।
জিএমও-মুক্ত অঞ্চল: শান্তির জীবন্ত ল্যান্ডস্কেপ
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায় তাদের এলাকাকে “জিএমও-মুক্ত অঞ্চল” এবং “বীজ স্বাধীনতা অঞ্চল” হিসেবে ঘোষণা করছে। এগুলো কেবল প্রতীকী ঘোষণা নয়; এগুলো হলো বাস্তবসম্মত “শান্তি অঞ্চল”, যেখানে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের অবসান ঘটানো হয়েছে।
- প্রাণের প্রত্যাবর্তন: এই অঞ্চলগুলোতে যখন কৃত্রিম কীটনাশক এবং পেটেন্ট করা একফসলী চাষ বন্ধ হয়, তখন সেখানে প্রাণের তাৎক্ষণিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পরাগায়নকারী পতঙ্গরা ফিরে আসে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল হয় এবং ল্যান্ডস্কেপের “জৈবিক বুদ্ধিমত্তা” নিজেকে মেরামত করতে শুরু করে।
- নতুন কৃষক সমাজ: “তরুণ কৃষক”দের এক নতুন প্রজন্ম—শহুরে মানুষ যারা আবার গ্রামে ফিরছে—তারা বীজ সার্বভৌমত্বকে একটি “নতুন কৃষি আন্দোলন” (New Agrarianism)-এর ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা প্রথাগত বীজ সংরক্ষণের সাথে আধুনিক পরিবেশ বিজ্ঞানকে যুক্ত করে উচ্চ-উৎপাদনশীল ক্ষুদ্র খামার তৈরি করছে।
ভবিষ্যৎ হবে বৈচিত্র্যময়, স্থানীয় এবং অভিযোজিত
বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি, তখন “মানসম্মত” বা স্ট্যান্ডার্ড শিল্পজাত বীজ ব্যর্থ হচ্ছে। ভবিষ্যৎ কেবল তাদেরই যারা বৈচিত্র্যময় এবং অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন।
- জলবায়ু সহনশীলতা: আমরা ২০৫০ সালের আবহাওয়ার সঠিক ধরণ আগে থেকে বলতে পারি না। তাই আমাদের উচিত যতটা সম্ভব বেশি জাতের বীজ সংরক্ষণ করা। জীববৈচিত্র্য হলো এমন এক “জেনেটিক লাইব্রেরি” যেখানে এমন সব সমস্যার সমাধান রয়েছে যা আমরা এখনো মোকাবিলাই করিনি।
- বিকেন্দ্রীকরণ: বীজের ক্ষমতা পাঁচটি বিশ্বজনীন কর্পোরেশনের হাত থেকে সরিয়ে পাঁচ মিলিয়ন স্থানীয় বীজ ব্যাংকে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে আমরা এমন একটি খাদ্য ব্যবস্থা তৈরি করছি যা “অ্যান্টি-ফ্রাজাইল” (Anti-fragile) বা ঘাত-সহিষ্ণু। এটি বৈশ্বিক ধাক্কা সহ্য করতে পারে কারণ এর শিকড় স্থানীয় সার্বভৌমত্বের গভীরে প্রোথিত।

আশার এক বিপ্লবী পদক্ষেপ
বিলিয়ন ডলারের কর্পোরেশন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সামনে দাঁড়িয়ে একটি মাত্র প্রাচীন দেশীয় (heirloom) বীজ সংরক্ষণ করাকে হয়তো খুব সামান্য কাজ মনে হতে পারে। তবে, কর্পোরেট বেষ্টনী বা জবরদখলের এই যুগে, এটিই আমাদের হাতে থাকা প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী ও বিপ্লবী পথ।
যখন আমরা বীজের স্বাধীনতা রক্ষা করি, তখন আমরা আসলে বিবর্তন, নবায়ন এবং বিকশিত হওয়ার জন্য সমস্ত প্রাণের স্বাধীনতাকেই রক্ষা করি। বীজ হলো আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রজ্ঞা এবং বংশধরদের টিকে থাকার মধ্যকার এক মেলবন্ধন বা সেতু। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে:
- জীবন কোনো উদ্ভাবন নয়: প্রকৃতির বুদ্ধিমত্তাকে কখনোই কোনো কর্পোরেট বোর্ডরুমে বন্দি বা “মালিকানাধীন” করা যায় না।
- বৈচিত্র্যই শক্তি: আমরা যত বেশি জাতের বীজ সংরক্ষণ করব, টিকে থাকার জন্য আমাদের হাতে তত বেশি হাতিয়ার থাকবে।
- খাদ্য একটি অধিকার, পণ্য নয়: আমাদের পুষ্টির ভিত্তি অবশ্যই তাদের হাতে থাকতে হবে যারা মাটির যত্ন নেন এবং ফসল ফলান।
“বীজ সত্যাগ্রহ” কেবল অতীতের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়; এটি ভবিষ্যতের এক উদযাপন। বীজকে পুনরায় নিজের অধিকারে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে আমরা আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, আমাদের স্বাস্থ্য এবং আমাদের স্বাধীনতাকেই পুনরুদ্ধার করি। ডঃ বন্দনা শিব প্রায়ই যেমনটি বলেন— “বীজই হলো আমাদের মুক্তির মূল কেন্দ্র।”
এখন সময় হয়েছে একটি নতুন পৃথিবীর বীজ বপন করার; একটি একটি করে দানা দিয়ে।
