বিশ্বযুদ্ধের শেষের পর জাপানি সৈনিক ২৮ বছর গোপন ছিলেন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তীব্র উত্তাপে প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়াম দ্বীপপুঞ্জে ১৯৪৪ সালের জুলাইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল জাপানি ও মার্কিন সেনারা। সেই সময় মার্কিন বাহিনীর ভীষণ আক্রমণের মুখে জাপানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। জাপানের রাজকীয় সেনাবাহিনীর ল্যান্স করপোরাল শোইচি ইয়োকোই তখন গুয়ামের গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে পড়েন।

প্রাথমিকভাবে তাঁর সঙ্গে কিছু সহযোদ্ধা ছিলেন, তবে ক্রমেই ক্রমশ ক্ষুধা, রোগ এবং ভয়াবহ পরিবেশের কারণে সবাই হারিয়ে যান। ১৯৬৪ সালের বিধ্বংসী বন্যার পর শোইচি একাকী হয়ে যান এবং এরপর আট বছর তিনি সম্পূর্ণ একাকী জঙ্গলে কাটান। এই সময়ের খাদ্য ছিল নদীর ইল, ব্যাঙ, ইঁদুর—যাদের মধ্যে অনেকের বিষাক্ত প্রজাতিও ছিল।

শেষ পর্যন্ত ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্থানীয় শিকারিরা তাঁকে উদ্ধার করেন। সেই সময় শোইচির বয়স ছিল ৫৭ বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় ২৮ বছর আগে শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু শোইচি তখনও বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ভাইপো অমি হাতাশিন বলেন, “উদ্ধারের সময় শোইচি ভীষণ আতঙ্কিত ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো তাঁকে বন্দি করা হবে, যা তাঁর এবং পরিবারের জন্য লজ্জার বিষয় হবে।”

উদ্ধারের পর শোইচিকে জাপানে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ‘যুদ্ধের নায়ক’ হিসেবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তবে আধুনিক জাপানের দ্রুত পরিবর্তিত সমাজে তিনি কখনো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেননি। হাতাশিন জানান, নতুন ব্যাংকনোট দেখে শোইচি বলেছিলেন, “এগুলো এখন মূল্যহীন।”

শোইচির জীবন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাইপো ১৯৭৪ সালে একটি জাপানি বই প্রকাশ করেন। পরে ২০০৯ সালে এটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়, শিরোনাম দেওয়া হয় ‘Private Yokoi’s War and Life on Guam, 1944–1972’

শোইচি ইয়োকোইর সংক্ষিপ্ত জীবনী ও যুদ্ধকালীন তথ্য:

তথ্যবিবরণ
জন্ম৩১ মার্চ ১৯১৫, শাওরি, আইচি প্রদেশ, জাপান
সামরিক যোগদান১৯৪১, জাপানের রাজকীয় সেনাবাহিনী
গুয়ামে অবস্থান১৯৪৪–১৯৭২
একাকীত্ব১৯৬৪–১৯৭২ (৮ বছর)
উদ্ধার২৪ জানুয়ারি ১৯৭২, গুয়াম
মৃত্যু২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭, নাগোয়া, জাপান

গুয়ামের জঙ্গলে শোইচির দীর্ঘ একাকীত্ব কেবল যুদ্ধের স্মৃতি নয়; এটি অদম্য মানসিকতা, সাহস এবং জীবনের প্রতি অবিচল মনোভাবের প্রতীক। গুয়ামের জাদুঘরে এখনও তাঁর তৈরি ইল ধরার ফাঁদ, ছবিসহ অন্যান্য নিদর্শন সংরক্ষিত আছে, যা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ও মানবসংবেদনার গভীর শিক্ষা দেয়।