বিশ্বকাপের আকাশে ড্রোন-আতঙ্ক: সতর্ক মেক্সিকোর সেনাবাহিনী

ফুটবল বিশ্বের মহোৎসব ‘ফিফা বিশ্বকাপ’ শুরু হতে আরও মাস চারেক বাকি থাকলেও আয়োজক দেশ মেক্সিকোতে এখন থেকেই সাজ সাজ রব। তবে এই প্রস্তুতির বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে মাঠের বাইরের নিরাপত্তা। বিশেষ করে গ্যালারির ওপরের আকাশে অননুমোদিত ড্রোন ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে মেক্সিকোর সেনাবাহিনী। সম্প্রতি মেক্সিকো সিটির একটি সামরিক ঘাঁটিতে অত্যাধুনিক ‘অ্যান্টি-ড্রোন’ সরঞ্জামের মহড়া ও প্রদর্শনী করেছেন দেশটির সেনাসদস্যরা। মূলত স্টেডিয়ামের ভেতরে দর্শকদের নিরাপত্তা এবং বহিরাগত আকাশপথের আক্রমণ নস্যাৎ করতেই এই আগাম প্রস্তুতি।


নিরাপত্তা প্রস্তুতির প্রেক্ষাপট ও ভেন্যুসমূহ

আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হবে ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। এই মহাযজ্ঞের মোট ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ১৩টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকোর মাটিতে। মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা এবং মনতেরি—এই তিনটি প্রধান ভেন্যুকে ঘিরে এখন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার জাল বুনছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

মেক্সিকোর বিশ্বকাপ ভেন্যু ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা একনজরে:

ভেন্যু শহরস্টেডিয়ামের নামম্যাচের সংখ্যাপ্রধান নিরাপত্তা ঝুঁকি
মেক্সিকো সিটিএস্তাদিও আজটেকা৫টিজনসমাগম ও ভিআইপি নিরাপত্তা।
গুয়াদালাহারাএস্তাদিও আকরন৪টিড্রোনের মাধ্যমে অননুমোদিত নজরদারি।
মনতেরিএস্তাদিও বিবিভিএ৪টিমাদক কার্টেল সম্বলিত এলাকা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

মাদক কার্টেল ও ড্রোনের মারণাস্ত্র হয়ে ওঠা

মেক্সিকোর সাধারণ মানুষের কাছে ড্রোন এখন আর কেবল শখের ভিডিওগ্রাফি বা ফটোগ্রাফির যন্ত্র নয়, বরং এটি এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। দেশটির কুখ্যাত মাদক কার্টেলগুলো, যেমন—সিনালোয়া, কার্টেল জালিস্কো নুয়েভা জেনারেশন (সিজেএনজি) এবং ফামিলিয়া মিচোয়াকানা গত কয়েক বছর ধরে ড্রোনকে শক্তিশালী মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত করেছে।

তারা ইন্টারনেট থেকে সাধারণ ড্রোন সংগ্রহ করে সেগুলোতে হাতে তৈরি বোমা বা বিস্ফোরক যুক্ত করে প্রতিপক্ষ ও সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। গত বছরের অক্টোবরে তিহুয়ানা শহরে সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয়ে ড্রোন থেকে বোমা ফেলার ঘটনাটি প্রশাসনকে বড় ধরনের নাড়া দিয়েছে। যদিও বিশ্বকাপের মূল ভেন্যুগুলো এই অপরাধপ্রবণ এলাকা থেকে দূরে, তবুও বিশ্বনেতা ও ফুটবল তারকাদের নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি নয় মেক্সিকোর সেনাবাহিনী।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও ‘অদৃশ্য দেয়াল’

সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ও ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ার ক্যাপ্টেন হোসে আলফ্রেডো লারা জানিয়েছেন, স্টেডিয়াম এবং ‘ফ্যান ফেস্ট’ এলাকাগুলোতে যেখানে সাধারণ মানুষের ভিড় থাকবে, সেখানে তারা একটি ‘ড্রোনবিরোধী অদৃশ্য দেয়াল’ তৈরি করবেন। সেনাবাহিনী মূলত দুই ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে:

১. সেমি-মোবাইল সিস্টেম: এটি স্টেডিয়ামের চারদিকে একটি নির্দিষ্ট সীমানা তৈরি করবে। কোনো অননুমোদিত ড্রোন এই সীমানার ভেতর প্রবেশ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সংকেত বাধাগ্রস্ত হবে এবং ড্রোনটি অকেজো হয়ে পড়বে।

২. পোর্টেবল অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম: এটি দেখতে অনেকটা ফিউচারিস্টিক লক্ষ্যভেদী বন্দুকের মতো। সেনাসদস্যরা এটি সরাসরি ড্রোনের দিকে তাক করে সেটির রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি জ্যাম করে দেবেন। এতে ড্রোনটি পাইলটের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলবে এবং হয় ক্র্যাশ করবে অথবা মাটির দিকে নেমে আসবে।

মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আশ্বস্ত করেছে যে, কেবল স্টেডিয়াম নয়, খেলোয়াড়দের হোটেল এবং যাতায়াতের পথগুলোকেও এই বিশেষ ড্রোন-সুরক্ষা কবচের আওতায় আনা হবে। ফুটবলের এই মহামিলন যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হতে পারে, সেটিই এখন দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য।