বিশিষ্ট বীমা ব্যক্তিত্ব শেখ কবির হোসেনের প্রয়াণ: একটি নক্ষত্রের পতন

বাংলাদেশের বীমা খাতের অভিভাবক এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সাবেক দীর্ঘমেয়াদী প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেন আর নেই। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি), ২০২৬ তারিখে সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। গত কয়েক বছর ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও শিক্ষা

শেখ কবির হোসেন ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চাচাতো ভাই ছিলেন। তার শিক্ষাজীবন অত্যন্ত উজ্জ্বল ছিল; তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলতার সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন এবং পরবর্তীতে বেসরকারি খাত ও সমাজসেবায় নিজেকে নিবেদিত করেন।

বীমা খাতে অসামান্য অবদান

শেখ কবির হোসেনকে বাংলাদেশের আধুনিক বীমা শিল্পের অন্যতম কারিগর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১১ সালে তিনি প্রথমবার বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর তার নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার কারণে টানা ১৩ বছর তিনি এই শীর্ষ পদে আসীন ছিলেন। দেশের বীমা খাতের সংস্কার, নীতি নির্ধারণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা সচেতনতা বৃদ্ধিতে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২৮ অক্টোবর তিনি বিআইএ-র সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স এবং ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান হিসেবেও সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

সাংগঠনিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততা

বীমা শিল্পের পাশাপাশি তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবামূলক অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। তার কর্মপরিধির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে প্রদান করা হলো:

প্রতিষ্ঠানের নামপদবী / ভূমিকা
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)সাবেক প্রেসিডেন্ট (২০১১-২০২৪)
ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিচেয়ারম্যান, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ
বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতিসাবেক চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিসাবেক চেয়ারম্যান
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)সাবেক চেয়ারম্যান
ন্যাশনাল টি কোম্পানিসাবেক চেয়ারম্যান
ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালভাইস চেয়ারম্যান
লায়ন্স ক্লাবস ইন্টারন্যাশনালসাবেক আন্তর্জাতিক পরিচালক

শেষ বিদায় ও দাফন সম্পন্ন

পারিবারিক ও বিআইএ সূত্র জানিয়েছে, মরহুমের প্রথম জানাজা রাজধানীর কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ ও বীমা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। জানাজা শেষে তার মরদেহ জন্মভূমি গোপালগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হবে এবং আগামীকাল সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদায় দাফন করা হবে।

তার মৃত্যুতে দেশের বীমা ও আর্থিক খাতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।