বিমানবন্দরে যাত্রীদের দুঃসহ অপেক্ষা

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার প্রভাব সরাসরি পড়েছে আন্তর্জাতিক আকাশপথে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে এবং বাংলাদেশের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী বিপুল সংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় শত শত যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেকে বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাচ্ছেন না।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে মধ্যপ্রাচ্যগামী মোট ১৭৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ ওই দিনই বাতিল হয়েছে অন্তত ২৮টি ফ্লাইট। বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস, কুয়েত এয়ারওয়েজ, জাজিরা এয়ারওয়েজ, এয়ার অ্যারাবিয়া, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একাধিক ফ্লাইট।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার এবং জর্ডান সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় এসব রুটে অনেক ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। তিনি যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন।

বিমানবন্দরে গিয়ে দেখা গেছে, বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীরা টার্মিনালের বিভিন্ন স্থানে উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। তাদের অনেকেই প্রবাসী শ্রমিক, যারা ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার জন্য ঢাকা এসেছিলেন। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তারা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

ফেনী থেকে আসা যাত্রী ইয়ার আলী জানান, তিনি এমিরেটস এয়ারলাইন্সের সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটের ফ্লাইটে দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন তার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, আগে যদি মোবাইল ফোনে বার্তা দেওয়া হতো, তাহলে এত দূর থেকে এসে বিপাকে পড়তে হতো না। আরেক যাত্রী তফাজ্জল হোসেন অভিযোগ করেন, ট্রাভেল এজেন্সি এবং এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হচ্ছে না, ফলে যাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন।

ফ্লাইট বাতিলের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন প্রবাসী কর্মীরা। অনেকেই স্বল্পমেয়াদি ভিসা নিয়ে বিদেশে ফেরার কথা ছিল। এখন দেশে আটকে পড়ায় তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে মানবিক বিবেচনায় সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। ইতোমধ্যে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর বলেন, যেসব প্রবাসী কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাদের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে দূতাবাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিদেশে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ঢাকা-দুবাই-ঢাকা রুটে দুটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে। ৪৩৬ আসনের এয়ারবাস এ৩৩০-৩০০ উড়োজাহাজ দিয়ে এই ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া বা শেষ হওয়ার পথে থাকা যাত্রীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ রুটে ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। আবুধাবি, শারজাহ, দুবাই, দোহা, কুয়েত এবং দাম্মামগামী সব ফ্লাইট পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তবে জেদ্দা, মদিনা, রিয়াদ এবং মাস্কাট রুটে ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

নিচে সাম্প্রতিক ফ্লাইট বাতিলের তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

তারিখবাতিল ফ্লাইট সংখ্যা
২৮ ফেব্রুয়ারি২৩টি
১ মার্চ৪০টি
২ মার্চ৪৬টি
৩ মার্চ৩৯টি
বুধবার২৮টি
মোট১৭৬টি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তাই যাত্রীদের দ্রুত ও স্পষ্ট তথ্য প্রদান এবং বিকল্প ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় বিমানবন্দরে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।