অনীল মুখার্জি ছিলেন উপমহাদেশের বিপ্লবী আন্দোলন, শ্রমিক রাজনীতি ও কমিউনিস্ট চেতনার এক অকুতোভয় সৈনিক। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত বিপ্লবী, শক্তিশালী সংগঠক, তাত্ত্বিক চিন্তাবিদ এবং লেখক—যাঁর জীবন জুড়ে ছিল শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস সংগ্রাম। তাঁর আদর্শ, কর্মপন্থা এবং লেখা আজও নতুন প্রজন্মকে বিপ্লবী চিন্তা ও সামাজিক ন্যায়ের পথে অনুপ্রাণিত করে।
জীবন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড:
অনিল মুখার্জি ১৯১২ সালের ১০ অক্টোবর মুন্সিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটান। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
১৯৩০ সালে কলেজে অধ্যয়নের সময় আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। মেদিনীপুর জেলে আটককালে সশস্ত্র বিপ্লবে যুক্ত থাকার অভিযোগে ব্রিটিশ শাসক তাঁকে আন্দামানের সেলুলার জেলে নির্বাসিত করে। কঠোর কারাবাসও তাঁর আদর্শ ও প্রত্যয়কে ভেঙে দিতে পারেনি; বরং বিপ্লবী মনোবলকে আরও দৃঢ় করেছে।
১৯৩৮ সালে মুক্তির পর আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী সংগঠক হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৪৬ সালের নারায়ণগঞ্জের সুতাকল শ্রমিক ধর্মঘটে তাঁর নেতৃত্ব অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল।
দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে তিনি ৮ বছর কারাবাসের জীবন কাটান। মুক্তির পরও রাজনৈতিক তৎপরতার অভিযোগে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকতে হয়, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত চলেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ও প্রেরণাদাতা হিসেবে কাজ করেন।
অনিল মুখার্জি পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট মহাসম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, যার সংখ্যা ৭৫টি। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন (১৯৭৩ ও ১৯৮০)।
প্রধান গ্রন্থসমূহ:
| গ্রন্থের নাম | প্রকাশের সাল | বিষয়বস্তু |
|---|---|---|
| সাম্যবাদের ভূমিকা | ১৯৭৫ | সাম্যবাদ ও তাত্ত্বিক চিন্তা |
| শ্রমিক আন্দোলনের হাতে খড়ি | ১৯৭৮ | শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস ও শিক্ষা |
| স্বাধীন বাংলাদেশ সংগ্রামের পটভূমি | ১৯৭৯ | মুক্তিযুদ্ধ ও দেশীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষণ |
| হারানো খোকা | ১৯৮১ | ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা ও বিপ্লবী জীবন |
অনিল মুখার্জির জীবনকাল ১৯৮২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়। তিনি আমাদের জন্য কেবল অতীতের নেতা নন, বরং তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম এবং লেখনী আজও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নে বিশ্বাসী মানুষদের প্রেরণা জোগায়।
বিপ্লবী অনিল মুখার্জির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি, যিনি নিজের জীবনকে পুরোপুরি উৎসর্গ করেছিলেন ন্যায় ও সমতার জন্য।
