দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে গভীর সংকটের মুখোমুখি। যদিও উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট, তবুও উচ্চ খরচ, জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, ভর্তুকির চাপ এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে খাতটি অর্থনৈতিক ও কাঠামোগতভাবে চাপে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, আগামী সরকারের জন্য অবিলম্বে বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় আগামী সরকারের টেকসই পথনির্দেশনা’ শীর্ষক এক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজন করে ‘জাস্ট এনার্জি নিউজ’, অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন সম্পাদক শামীম জাহাঙ্গীর।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মূলত প্রাইমারি এনার্জিতে দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। এলএনজি আমদানিতে এফএসআরইউ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে দুটি এফএসআরইউর সক্ষমতার বাইরে জরুরি আমদানির সুযোগ নেই।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “২০০১ সালের পর দেশে কোনো বাস্তবভিত্তিক রিজার্ভার ম্যানেজমেন্ট স্টাডি হয়নি। গ্যাস অনুসন্ধানেও ১৬ বছর ধরে স্থবিরতা বিরাজ করছে।”
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশের মোট জ্বালানির ৯৭–৯৮ শতাংশ ফসিল ফুয়েলভিত্তিক। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। গ্যাস খাতে দৈনিক চাহিদা ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ মাত্র ২৫০০–২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।” তিনি আরও যোগ করেন, প্রযুক্তিগত ক্ষতি বাদেও প্রায় ১০ শতাংশ গ্যাস অপচয় ও চুরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিম্নলিখিত টেবিলে উপস্থাপন করা হলো:
| খাত | দৈনিক চাহিদা/ব্যবহার | সরবরাহ/উৎপাদন | আংশিক নির্ভরতা | বিশেষ মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|
| গ্যাস | ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট | ২,৫০০–২,৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট | ৬০% বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার | প্রায় ১০% চুরি/অপচয় |
| বিদ্যুৎ | ১৬,০০০ মেগাওয়াট | ১৪,০০০ মেগাওয়াট | ৬০% আমদানিকৃত জ্বালানিতে নির্ভর | দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ অপরিহার্য |
| নবায়নযোগ্য | — | ২.৩% ব্যবহার | নিম্ন | সৌর, বায়ু, বায়োমাসে বৃদ্ধি সম্ভাবনা |
অতিথির বক্তব্যে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “বিদ্যুৎ একদিকে বাণিজ্যিক পণ্য, অন্যদিকে জনসেবা। সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। নতুন সরকারের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।”
বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ, বায়োমাস ও ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হবে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রণয়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, উচ্চ ভর্তুকি, আমদানি নির্ভরতা এবং দুর্নীতির কারণে দেশ দ্রুত হাইপার ইনফ্লেশনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নতুন সরকারকে কঠিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অন্যথায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের পথ দীর্ঘমেয়াদে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
