চট্টগ্রাম নগরে চাঞ্চল্যকর এক বিশেষ অভিযানে বিদেশি সাব-মেশিনগান (এসএমজি), পিস্তল ও রিভলবারসহ দুর্ধর্ষ তিন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ধৃত ব্যক্তিরা বিদেশে আত্মগোপনে থাকা চট্টগ্রামের কুখ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। মঙ্গলবার (১০ মার্চ, ২০২৬) নগরের বিভিন্ন স্থানে পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। উদ্ধারকৃত এই আগ্নেয়াস্ত্রগুলো ব্যবহার করেই সম্প্রতি চট্টগ্রামের এক স্বনামধন্য ব্যবসায়ীর বাসভবনে গুলি বর্ষণ করা হয়েছিল।
Table of Contents
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় ও উদ্ধারকৃত সরঞ্জাম
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে ইমন, মোহাম্মদ মনির ও মোহাম্মদ সায়েম। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে রয়েছে একটি অত্যাধুনিক এসএমজি, একটি বিদেশি রিভলবার এবং একটি উন্নত মানের পিস্তল। নিচে গ্রেপ্তারকৃতদের বিস্তারিত তথ্য ও উদ্ধারকৃত অস্ত্রের বিবরণ একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| নাম ও পরিচয় | উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও সরঞ্জাম | উৎস ও সংশ্লিষ্টতা |
| আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী (ইমন) | বিদেশি থ্রি-টু বোর রিভলবার ও ৯ রাউন্ড গুলি | পাহাড়তলী থানা থেকে লুণ্ঠিত (৫ আগস্ট ২০২৪) |
| মোহাম্মদ মনির | ব্রাজিলিয়ান টরাস নাইন এমএম পিস্তল ও ১টি মোটরসাইকেল | ডবলমুরিং থানা থেকে লুণ্ঠিত (৫ আগস্ট ২০২৪) |
| মোহাম্মদ সায়েম | ১টি এসএমজি, ২টি ম্যাগাজিন ও ৫০ রাউন্ড গুলি | খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে সংগৃহীত |
ব্যবসায়ীর বাসভবনে হামলা ও তদন্তের অগ্রগতি
মঙ্গলবার রাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নগরের চন্দনপুরা এলাকায় ‘স্মার্ট গ্রুপ’-এর চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর বাসভবনে সন্ত্রাসীরা গুলি চালায়। এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে তা না পাওয়ায় এই হামলার ঘটনা ঘটেছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করেছেন যে, উদ্ধারকৃত এই তিনটি অস্ত্রই ওই দিনের হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগ্নেয়াস্ত্রগুলোর ব্যালিস্টিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই দাবির চূড়ান্ত সত্যতা নিশ্চিত করা হবে।
ভয়ংকর অপরাধের ইতিহাস
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে ইমন অত্যন্ত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। তিনি ২০০০ সালে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ‘আট হত্যা’ মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থেকে তিনি বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদের নির্দেশে চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছিলেন। পুলিশের অভিযানে ইমনের মোবাইল ফোন থেকে সাজ্জাদ গ্রুপের নতুন সদস্যদের শপথ গ্রহণের একটি গোপন ভিডিও ক্লিপও উদ্ধার করা হয়েছে, যা এই গ্যাংয়ের সাংগঠনিক তৎপরতার প্রমাণ দেয়।
অন্যদিকে, গ্রেপ্তারকৃত মনির ও সায়েমের বিরুদ্ধেও খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনে অন্তত ১০টি করে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তারা মূলত বায়েজিদ বোস্তামী, খুলশী ও পাঁচলাইশ এলাকায় বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ এবং বড় বড় শিল্প গ্রুপ থেকে চাঁদাবাজির কাজ তদারকি করতেন।
লুণ্ঠিত অস্ত্রের ব্যবহার ও জননিরাপত্তা
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, উদ্ধারকৃত রিভলবার ও পিস্তলটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন নগরের পাহাড়তলী ও ডবলমুরিং থানা থেকে লুট করা হয়েছিল। পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রগুলো এখন পেশাদার অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়ায় জননিরাপত্তায় বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উদ্ধারকৃত এসএমজিটি পাহাড়ি এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানা গেছে, যা অস্ত্র পাচারের একটি নতুন রুট সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে নতুন করে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বড় সাজ্জাদ ও তার সহযোগীদের পুরো নেটওয়ার্ক নির্মূল করতে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাও তৎপর রয়েছে।
