বিদেশে কর্মী নারীদের নির্যাতন উদ্বেগজনক বৃদ্ধি

ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে গমন করা বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের মধ্যে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা একটি গুরুতর মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন, যারা প্রায়শই চরম নির্যাতনের শিকার ছিলেন।

কুড়িগ্রামের এক নারী সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যোগ দেন, কিন্তু সেখানে গৃহকর্তার দ্বারা ধর্ষিত হয়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন। জীবন রক্ষার জন্য তিনি রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নেন এবং দুই মাস পর দেশে ফেরেন। রংপুরের আরেক নারী স্বামীর মৃত্যু ও আর্থিক চাপে সৌদি আরবে যান; সেখানে তিনি বাড়ির লোক এবং বাইরে থেকে আসা পুরুষদের দ্বারা নির্যাতিত হন। যশোরের এক নারী জানান, গৃহকর্তা, তাঁর ছেলে ও ছেলের বন্ধুদের দ্বারা তিনি যৌন নিপীড়নের শিকার হন।

বিদেশে কর্মী নারীর পরিসংখ্যান

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) জানাচ্ছে, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি নারী বিদেশে কর্মরত। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন, যাদের মধ্যে ৮০০ নারীর মৃতদেহ দেশে এসেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি নারী পাচারের শিকার হয়েছেন।

বছরফেরত আসা নারী (বিমানবন্দর তথ্য)মন্তব্য
২০১৯৩,১৪৪বন্দি হিসেবে ফিরেছেন
২০২০৪৯,০২২করোনাকাল পর্যায়
২০২১১,৮১১দেশে ফিরেছেন
২০২২৬,০২৯বিভিন্ন কারণে
২০২৩২,৯১৬দেশে ফিরেছেন
২০২৪৩,৩৭৫নির্যাতনের শিকার
২০২৫১,৮৯১বন্দি ও শোষিত

১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি নারী বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে যান, এবং ২০০৪ সালে এটি ধারাবাহিক হয়ে ওঠে। ২০১৩ সালে প্রথমবার বছরে ৫০ হাজারের বেশি নারী বিদেশে যান। সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর চুক্তির পর ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে গেছেন।

ফেরত আসা নারীদের অভিজ্ঞতা

ফেরত আসা নারীরা জানিয়েছেন, তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, অতিরিক্ত কাজের চাপ, ঠিকমতো খাবার না পাওয়া এবং বেতন না পাওয়ার মতো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। ব্র্যাক জানিয়েছে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা অন্তত ১২১ নারীর পাশে তারা দাঁড়িয়েছেন।

মৌলভীবাজারের রিজিয়া বেগম ছয় বছর আগে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যান। দীর্ঘ নির্যাতনের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বিমানবন্দরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় উদ্ধার হন। ব্র্যাক ও পিবিআইয়ের সহযোগিতায় পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারে ফেরানো সম্ভব হয়।

সৌদি আরবের দূতাবাস জানিয়েছে, প্রতিদিন ৩–৪ জন নারী অতিরিক্ত কাজের চাপ ও নির্যাতনের কারণে আশ্রয় নিচ্ছেন। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৩৫% নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরেছেন এবং ৪৪% নিয়মিত বেতন পাননি।

নারী নিরাপত্তার গুরুত্ব

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেছেন, বিদেশে নির্যাতিত নারীদের অভিজ্ঞতা মূলত তিনটি: কাজ ও বেতন সংক্রান্ত সমস্যা, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন নিপীড়ন। প্রায়শই রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া তারা ক্ষতিগ্রস্ত থাকেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক’ নারী সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের গুরুত্বের প্রতি আলোকপাত করছে।

ফেরত আসা নারীদের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে যে, বিদেশে গমন করা শ্রমিক নারীদের যথাযথ সুরক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।