বিদেশি বিনিয়োগে মূলধন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করল বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগকৃত শেয়ার হস্তান্তর বা বিক্রয়লব্ধ অর্থ নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধন প্রত্যাবাসনে আর বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না।

নীতিমালায় আমূল পরিবর্তন ও সহজীকরণ

আগের নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের লভ্যাংশ বা শেয়ার বিক্রির অর্থ বিদেশে পাঠাতে চাইলে প্রতি পদে পদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হতো। যদিও ২০২০ সালে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ পাঠানোর ক্ষমতা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়েছিল, তবে তা বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অপর্যাপ্ত ছিল। নতুন নির্দেশনায় এই সীমা ১০ গুণ বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানির বিদেশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য এই নিয়ম কার্যকর হবে।

নিচে নতুন নীতিমালার প্রধান দিকগুলো একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়ের বিবরণপূর্ববর্তী নিয়ম/সীমাবর্তমান সহজীকৃত নিয়ম
বিনা অনুমতিতে অর্থ প্রেরণসর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকাসর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত
মূল্যায়ন প্রতিবেদন (Valuation)সকল লেনদেনে বাধ্যতামূলক ছিল১ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনে প্রয়োজন নেই
অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষঅধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকবাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কমিটি
লেনদেন সম্পন্ন করার সময়দীর্ঘসূত্রতা বিদ্যমান ছিলঅসংগতি না থাকলে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে
আর্থিক বিবরণীর মেয়াদসুনির্দিষ্ট কঠোরতা ছিল নাসমঝোতার তারিখ হতে সর্বোচ্চ ৬ মাস পুরোনো

স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণ

মূলধন ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াটি সহজ করা হলেও এতে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম না ঘটে, সেদিকেও কড়া নজর রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে এখন থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করতে হবে। ছোট অংকের লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (CFO) এবং বড় অংকের (১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত) লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (CEO) নেতৃত্বে এই কমিটি কাজ করবে। এই কমিটিতে চার্টার্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (CFA) বা সমমানের পেশাদার সনদধারী সদস্য থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শেয়ারের ন্যায্যমূল্য যাচাই করবেন।

মূল্যায়ন পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড

শেয়ারের সঠিক দাম নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তিনটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণের নির্দেশনা দিয়েছে। এগুলো হলো— নিট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV) পদ্ধতি, মার্কেট অ্যাপ্রোচ এবং ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো (DCF) পদ্ধতি। যদি বিক্রয়মূল্য কোম্পানির সর্বশেষ নিরীক্ষিত নিট অ্যাসেট ভ্যালুর নিচে থাকে, তবে লেনদেনের পরিমাণ যাই হোক না কেন, ব্যাংকগুলো কোনো জটিলতা ছাড়াই অর্থ বিদেশে পাঠানোর অনুমতি দিতে পারবে। এতে করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে আস্থা ফিরবে। বিনিয়োগের অর্থ সহজে ফেরত নেওয়ার নিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী হন। এটি মূলত ‘Exit Policy’ বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পথ সহজ করার একটি অংশ, যা পরোক্ষভাবে ‘Entry’ বা নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে এই সেবার জন্য যুক্তিসঙ্গত মাশুল আদায় করতে পারবে, যা ব্যাংকিং খাতের আয় বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।