ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট এখন এক চরম নাটকীয় মোড় নিয়েছে। দেশটির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর হাতে অপসারিত ও আটক করার পর বর্তমানে কারাকাস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শুরু হয়েছে ‘তেল যুদ্ধ’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের মজুদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা কোনো বিদেশি শক্তির আজ্ঞাবহ নয়।
তেল সম্পদ নিয়ে ট্রাম্পের উচ্চাভিলাষ
মঙ্গলবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রকে দেবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই তেল বিক্রির অর্থ তাঁর প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করবে এবং তা দুই দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। তিনি মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটকে এই প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের সূত্রমতে, এই তেলের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে জাহাজে বোঝাই করা হয়েছে এবং তা মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
নিচে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
ভেনেজুয়েলার তেল মজুত ও বাজার পরিস্থিতি
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত পরিসংখ্যান |
| মোট তেল মজুত (২০২৩) | ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল (বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয়)। |
| প্রস্তাবিত সরবরাহের পরিমাণ | ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল। |
| বর্তমান তেলের বাজারদর (US) | ব্যারেলপ্রতি ৫৬ ডলার। |
| ভেনেজুয়েলার তেলের দর | ব্যারেলপ্রতি ৫৫ ডলার। |
| সম্ভাব্য রাজস্ব আয় | প্রায় ২৭৫ কোটি মার্কিন ডলার। |
| বৈশ্বিক দৈনিক চাহিদা | প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল। |
বিশেষজ্ঞদের সংশয় ও তেলের হিসাব
ট্রাম্পের এই ঘোষণা নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বেকার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ মার্ক ফিনলে আল-জাজিরাকে জানান, ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল শুনতে বিশাল মনে হলেও সারা বিশ্বের প্রতিদিনের চাহিদার তুলনায় এটি খুবই নগণ্য। যুক্তরাষ্ট্র একাই প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল ব্যবহার করে। ফলে এই তেল যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য হয়, তবে বাজারে এর প্রভাব হবে সামান্য। অন্যদিকে, অন্য দেশের তেলের লভ্যাংশ যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বণ্টন করবে, তা নিয়ে আইনগত অস্পষ্টতা রয়ে গেছে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের বিশেষজ্ঞ স্কট মন্টগোমেরি।
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অনড় দেলসি রদ্রিগেজ
গত শনিবার মার্কিন সামরিক হামলার মাধ্যমে নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কের আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ভেনেজুয়েলা এখন তাঁর নির্দেশে চলছে। তবে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এই দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “বিদেশি কোনো এজেন্ট ভেনেজুয়েলা শাসন করছে না। এদেশের সরকারই সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করছে।” রদ্রিগেজের এই বক্তব্যের সমর্থনে কারাকাসে হাজার হাজার নারী ও সরকারি বাহিনীর সদস্যরা বিশাল মিছিল করেছেন। এমনকি ক্যালিফোর্নিয়াতেও ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হতে দেখা গেছে।
উপসংহার
১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজ ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভেনেজুয়েলার তেল খাত জাতীয়করণ করা হয়েছিল। এখন ট্রাম্পের এই ‘তেল দখল’ নীতি এবং দেলসি রদ্রিগেজের অনড় অবস্থান দেশটিকে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তেলের দাম কমার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করছে কারাকাসের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
