বিএনপির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত শপথ নেবেন না আবদুল হান্নান

চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে নবনির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মো. আবদুল হান্নান এক চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর আজীবনের রাজনৈতিক দল বিএনপি তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন না। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) দুপুরে ফরিদগঞ্জ প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই অবস্থান পরিষ্কার করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের মাত্র দুই দিন পর তাঁর এই ঘোষণা স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনের প্রেক্ষাপট ও বক্তব্য

সংবাদ সম্মেলনে আবদুল হান্নান ফরিদগঞ্জের সর্বস্তরের জনগণ, স্থানীয় প্রশাসন এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “আমি ছাত্রজীবন থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে ধারণ করে বিএনপির রাজনীতি করে আসছি এবং আমৃত্যু এই আদর্শেই অবিচল থাকব।” তিনি দাবি করেন যে, তাঁর এই স্বতন্ত্র নির্বাচনটি দলের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ নয়, বরং স্থানীয় একটি বিশেষ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল।

আবদুল হান্নান তাঁর বক্তব্যের সপক্ষে বিগত দিনের রাজনৈতিক বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ইতিপূর্বে দুইবার তিনি এই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেলেও একটি ‘কুচক্রী মহল’ তা ছিনিয়ে নিয়েছিল। এবারও মনোনয়ন না পাওয়ায় তাঁর অনুসারী ও তৃণমূল নেতা-কর্মীরা তাঁকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাপ প্রয়োগ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমি আমার প্রিয় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে লড়িনি; আমি লড়াই করেছি সেই জনবিচ্ছিন্ন মহলের বিরুদ্ধে যারা ফরিদগঞ্জে বিএনপির প্রকৃত শক্তিকে ধ্বংস করতে চায়।”

নির্বাচনের ফলাফল এক নজরে

চাঁদপুর-৪ আসনে এবারের লড়াই ছিল মূলত বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। নির্বাচনের সংক্ষিপ্ত ফলাফল নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রার্থীর নামরাজনৈতিক পরিচয়প্রতীকফলাফল
মো. আবদুল হান্নানস্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী)ঈগল/অন্যান্যবিজয়ী
অঘোষিত/দলীয় প্রার্থীমনোনীত (বিএনপি)ধানের শীষপরাজিত
ভোটের ব্যবধানউল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয়ী

শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর হুঁশিয়ারি

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা ও অপপ্রচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন আবদুল হান্নান। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনে পরাজিত হয়ে একটি কুচক্রী পক্ষ এলাকায় অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তিনি প্রশাসনের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, “জনগণের জানমালের ক্ষতি হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।” একই সাথে তিনি তাঁর কর্মী-সমর্থকদের উসকানি এড়িয়ে ধৈর্য ও শান্তি বজায় রাখার নির্দেশ দেন।

রাজনৈতিক তাৎপর্য

মো. আবদুল হান্নানের এই শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনীতিতে এক বিরল দৃষ্টান্ত। সাধারণত প্রার্থীরা জয়ের পর দ্রুত শপথ নিতে মরিয়া থাকেন, কিন্তু হান্নান দলীয় সম্মানের প্রতি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এটি বিএনপির হাইকমান্ডের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তিনি চান দল তাঁর বিজয়কে ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে না দেখে ‘জনগণের ম্যান্ডেট’ হিসেবে গ্রহণ করুক এবং তাঁকে পুনরায় সসম্মানে দলে ফিরিয়ে নিক।

আগামী মঙ্গলবার সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিন নির্ধারিত রয়েছে। আব্দুল হান্নানের এই অনড় অবস্থানের কারণে ওই দিন তিনি সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেল। এখন দেখার বিষয়, বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় তাঁকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফরিদগঞ্জের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা এখন তাকিয়ে আছেন রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দিকে।