গত এক দশকে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা Global Financial Integrity-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে দেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বাইরে চলে গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে) এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
এই অর্থ পাচারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মূল্য কারসাজি বা মিথ্যা ঘোষণা, যা ট্রেড মিসইনভয়েসিং নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের প্রকৃত মূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে কম বা বেশি দেখানো হয়, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা বৈধ হিসাবের বাইরে চলে গিয়ে বিদেশে পাচার হয়ে যায়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বছরে গড়ে প্রায় ৬৮৩ কোটি ডলার বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে, যা মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলার উন্নত দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ ধরনের প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং দেশের আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলার ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ এখানে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও নজরদারি এখনও দুর্বল। বৈশ্বিক পর্যায়ে একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে।
তুলনামূলক বৈশ্বিক চিত্র
| দেশ | আনুমানিক অর্থ পাচার | সময়কাল | বাণিজ্যের অনুপাতে হার |
|---|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ৬,৮৩০ কোটি ডলার | ১০ বছর | ১৬ শতাংশ |
| China | ৬.৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার | ১০ বছর | প্রায় ২৫ শতাংশ |
| India | ১.০৬ ট্রিলিয়ন ডলার | ১০ বছর | প্রায় ২২ শতাংশ |
| Thailand | ১.১৮ ট্রিলিয়ন ডলার | ১০ বছর | উল্লেখযোগ্য |
উপরের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বড় অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রেও বাণিজ্যভিত্তিক অবৈধ অর্থ প্রবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মোট বাণিজ্যের তুলনায় ঝুঁকির মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গঠিত একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে আরও বিস্তৃত তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকার সমান। ওই সময়ে গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে বাইরে চলে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
এই অর্থ পাচারের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালী গোষ্ঠী জড়িত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তি, বড় ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের কিছু প্রভাবশালী চক্র, আমলা এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাবাহিক অর্থ পাচার দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য মারাত্মক হুমকি। একই সঙ্গে সরকারি রাজস্ব আহরণ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদরা এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে শুল্ক প্রশাসন শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা উন্নত করা, বাণিজ্য লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে সমন্বিত নজরদারি বৃদ্ধি করা। না হলে ভবিষ্যতে এই অর্থ পাচারের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
