বাজার আনতে বের হয়েছিলেন, লাশ হয়ে ফিরলেন! মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবল সাত সদস্যের পরিবার

রংপুর–দিনাজপুর মহাসড়কে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সাত সদস্যের একটি স্বল্পবিত্ত পরিবারকে মুহূর্তে দিশেহারা করে দিয়েছে। ইজিবাইক চালক গোলাম মোস্তফা (৩৫), যিনি প্রতিদিনের মতো ভোরে জীবিকার টানে কাজে বের হয়েছিলেন, তিনি আর সেই সন্ধ্যায় জীবিত অবস্থায় ঘরে ফিরতে পারেননি। বাজার হাতে ফিরে আসার কথা ছিল সন্ধ্যায়, কিন্তু ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে। তাঁর মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা গ্রামই শোকের ছায়ায় আচ্ছন্ন।

শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর–দিনাজপুর মহাসড়কের ব্রাদার্স হিমাগারের সামনে দ্রুতগতির একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। মোস্তফার বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের উত্তর রহিমাপুর জয়বাংলা গ্রামে। তিনি ছিলেন পরিবারে একমাত্র আয়–উপার্জনক্ষম সদস্য।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়—মোস্তফার বাবা ইসহাক আলী দীর্ঘদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। তিনি নিজেও তার যৌবনের পুরোটা সময় সিলেটে রিকশা চালিয়ে ছেলেকে বড় করেছেন। জমিজমা বলতে কিছুই নেই পরিবারের। দুই শতক জমির ওপর টিনের দুটি ঘরই ছিল তাঁদের সব সম্বল। মোস্তফার আয়ের একমাত্র উৎস ছিল একটি ইজিবাইক; সংসারের প্রতিটি সদস্যের খাবার, ওষুধ, পোশাক—সবই নির্ভর করত তাঁর প্রতিদিনের আয়ের ওপর।

তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে স্কুলে পড়ে, মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে, আর ছোট সন্তান হাফিজিয়া মাদ্রাসায়। সংসারের চাপে কখনোই পড়াশোনা থামিয়ে দেননি তাঁদের কোনোকে। তাই পরিবারের সবার মনে ছিল মোস্তফার প্রতি এক অগাধ ভরসা।

দুর্ঘটনা সম্পর্কে পুলিশ জানায়—মোস্তফা তারাগঞ্জ চৌপথী থেকে নিজ বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। মহাসড়ক পার হওয়ার সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি মোটরসাইকেল সরাসরি ধাক্কা দেয় তাঁর ইজিবাইকে। তিনি সড়কে ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। পুলিশ মোটরসাইকেলটি জব্দ করেছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।

সন্ধ্যার পর তাঁর বাড়িতে গেলে দেখা যায়—পরিবারের শোকাবহ পরিবেশ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। স্ত্রী আবেদা বেগম বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। তিনি বিলাপ করতে করতে বলছিলেন,
“বাজার আনতে গেছিলো, আর ফিরল লাশ হয়ে… কোন দোষে আমার স্বামীটা মারা গেল?”

মোস্তফার বাবা ইসহাক আলীর কান্নায় পুরো বাড়ি ভারী হয়ে ওঠে। তিনি বারবার বলছিলেন,
“আমারে কে ওষুধ দেবে? ছাওয়াগুলোর মুখে ভাত দিবে কে? এখন সংসার চলবে কেমন করে?”

মোস্তফার মা মোসলেমা বেগমও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন সংবাদ শুনে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মোনায়েম খান বলেন,
“এই পরিবার পুরোপুরি মোস্তফার আয়ের ওপর নির্ভর ছিল। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারের ছয় সদস্য সম্পূর্ণ অসহায়ের মতো হয়ে গেল।”

প্রতিবেশীরাও জানালেন—মোস্তফা ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও ভদ্রস্বভাবের মানুষ। ইজিবাইক চালিয়ে কষ্ট করে বাবা–মা, স্ত্রী–সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতেন। তাঁর মৃত্যু পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও জীবন নিভে যাচ্ছে। খুব সাধারণ, পরিশ্রমী মানুষেরাই এ দুর্ঘটনার শিকার হন বেশি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য মারা গেলে পুরো পরিবার দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়ে পড়ে। এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল—সড়কের নিরাপত্তা প্রশ্নে এখনও অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে।

মোস্তফা নেই, কিন্তু তাঁর অভাব, শূন্যতা ও কান্না আগামী বহু বছর ধরে বয়ে বেড়াবে এই পরিবারের সাতজন সদস্য। তাঁদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত, আর দায়িত্ব এসে পড়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর—তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর, সহায়তা দেওয়ার, এবং সড়ক নিরাপত্তায় আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার।