দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। গত কয়েক দিনের তীব্র সংকটের পর মঙ্গলবার (১০ মার্চ, ২০২৬) রাজধানীর প্রধান পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে নতুন চালানের দেখা মিলেছে। তবে সরবরাহ বাড়লেও বাজার থেকে শঙ্কা ও অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। ক্রেতারা এক দোকানে তেল না পেলেও বিকল্প দোকানে ঘুরে প্রয়োজনীয় পণ্যটি সংগ্রহ করতে পারছেন। ঢাকার কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল এবং চন্দ্রিমা কাঁচাবাজার ঘুরে পরিস্থিতির এই আংশিক উন্নতির চিত্র দেখা গেছে।
Table of Contents
বাজারভিত্তিক সরবরাহ ও মূল্যের চিত্র
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত সোমবার দিবাগত রাত থেকে বিভিন্ন বিপণনকারী কোম্পানি বাজারে বোতলজাত তেলের সরবরাহ বাড়াতে শুরু করেছে। মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকার কাঁচাবাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল ৪০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, সরবরাহ বাড়লেও তা চাহিদার তুলনায় এখনো অর্ধেকেরও কম। কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, ১ ও ২ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও ৫ লিটারের বড় বোতলের সরবরাহ এখনো অত্যন্ত সীমিত।
নিচে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সয়াবিন তেলের বর্তমান দর ও পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| তেলের ধরণ | পরিমাণ | বর্তমান বাজারমূল্য (টাকায়) | গত সপ্তাহের মূল্য (টাকায়) |
| বোতলজাত সয়াবিন | ১ লিটার | ১৯৫ – ২০০ | ১৯০ – ১৯২ |
| বোতলজাত সয়াবিন | ২ লিটার | ৪০০ | ৩৮৫ – ৩৯০ |
| খোলা সয়াবিন | ১ লিটার | ১৯৮ – ২০০ | ১৯৩ – ১৯৫ |
| খোলা পাম অয়েল | ১ লিটার | ১৬৫ – ১৭০ | ১৬০ – ১৬২ |
| খোলা সয়াবিন (ড্রাম) | ২০৪ লিটার | ৪০০ টাকা বৃদ্ধি (ড্রামপ্রতি) | স্থিতিশীল ছিল |
সংকটের নেপথ্যে বহুমুখী কারণ
বাজারে এই অস্থিতিশীলতার পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে ‘আতঙ্কিত কেনাকাটা’ বা প্যানিক বায়িং শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল মজুত করায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, পরিবহন ধর্মঘট বা সংকট একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি বাণিজ্য সচিবকে এক চিঠিতে জানিয়েছে যে, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে তারা তাদের নিজস্ব পরিবহনের অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না। এমনকি ভাড়ায় চালিত ট্রাক বা লরিও পাওয়া যাচ্ছে না, যা রিফাইনারি থেকে বাজারে তেল পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
খুচরা বিক্রেতাদের উদ্বেগ ও অভিযোগ
মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটের নূর জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী নূরে আলম জানান, রমজান মাস চলায় তেলের চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। যেখানে দৈনিক ১০০ কার্টন তেলের চাহিদা রয়েছে, সেখানে কোম্পানিগুলো মাত্র ৪০-৫০ কার্টন সরবরাহ করছে। অন্যদিকে, কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা রিয়াদ হোসেনের মতে, খোলা তেলের দাম ড্রামপ্রতি প্রায় ৪০০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় খুচরা পর্যায়ে লিটারপ্রতি ৫-৬ টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ভোজ্যতেলের এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উৎপাদনকারীরা। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। সরকার যদি দ্রুত জ্বালানি তেলের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে পারে, তবেই ভোজ্যতেলের সরবরাহ চেইন পুনরায় পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরবে এবং দাম স্থিতিশীল হবে।
