বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু চরিত্র আছে, যেগুলো কেবল একটি পর্দার উপস্থিতি হয়ে থাকেনি, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক স্মৃতি। ১৯৬৭ সালে খান আতাউর রহমান পরিচালিত কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’–তে নবাবের পক্ষে যুদ্ধরত ফরাসি সেনাপতি মিঃ সিনফ্রের চরিত্রটি ঠিক তেমনই একটি অনন্য উদাহরণ। পলাশীর আম্রকাননে দাঁড়িয়ে নবাবকে দেওয়া তার দৃপ্ত ঘোষণা—
“নবাব, আপনি হামাদের যাহা বলিবেন, হামরা তাহাই করিবে”—
এই সংলাপটি আজও দর্শকের মনে ইতিহাসের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার প্রতীক হয়ে আছে।
এই চরিত্রের রূপকার ছিলেন অভিনেতা ও ঘোষক মডি কোহেন। তাঁর পূর্ণ নাম মর্ডিকাই হাইম কোহেন। ১৯৪৪ সালের ৩০ জুন বরেন্দ্রভূমি রাজশাহীতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছিলেন বংশগতভাবে ইহুদি হলেও আত্মিকভাবে পুরোপুরি বাঙালি সংস্কৃতির সন্তান। রাজশাহীর একটি সুপরিচিত ও সম্মানিত ইহুদি পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা, যেখানে ধর্ম কখনো সামাজিক সম্পর্কের দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি।
শৈশব ও কৈশোরে মডি ছিলেন প্রাণোচ্ছ্বল, সাহসী ও ব্যতিক্রমী। পিতা রাহেমিয কোহেনের সাইকেলের দোকান ও গ্যারেজ ছিল রাজশাহীর গণকপাড়া ও রানীবাজার এলাকায়। সাইকেল মেরামতের সেই পরিবেশই যেন তাঁকে গড়ে তুলেছিল একজন দক্ষ সাইক্লিস্ট হিসেবে। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে পড়াকালীন তিনি বারবার সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। ক্যাডেট কোর, নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সবখানেই ছিল তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি।
১৯৬২ সালে মাধ্যমিক পাশ করার পর তিনি রাজশাহী সিটি কলেজের নৈশ বিভাগে ভর্তি হন। এই সময় থেকেই তাঁর কণ্ঠের জাদু ধরা পড়ে রেডিও বাংলাদেশ, রাজশাহীতে। নিয়মিত ঘোষক হিসেবে তাঁর উচ্চারণ, ভাষার সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাস শ্রোতাদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি বোর্ড পরীক্ষার খাতায় প্রশ্ন না মিললেও ভয় না পেয়ে জনপ্রিয় বাংলা গানের কথা লিখে খাতা পূরণ করার গল্পটি আজও রাজশাহীর মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
সুদর্শন চেহারা ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বই তাঁকে টেনে নেয় চলচ্চিত্র জগতে। ষাটের দশকে তিনি বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষাতেই অভিনয় করেন। নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মানুষ অমানুষ, তুম মেরে হো–এর পাশাপাশি কলকাতায় সাগিনা মাহাতো, সাগিনা ও এক যে ছিল দেশ–এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
মডি কোহেন কেবল একজন অভিনেতাই নন, ছিলেন বাচিক শিল্প ও উপস্থাপনার পথিকৃৎ। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলে তিনিই হন প্রথম ঘোষক ও সংবাদ পাঠক। তাঁর কণ্ঠে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার সংবাদের দৃঢ়তা ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁকে দেশ ছাড়তে হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একাধিকবার দেশে ফিরে এসে তিনি প্রমাণ করেছেন—ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধন ভৌগোলিক সীমার চেয়েও শক্তিশালী। ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর তাঁর প্রয়াণ হলেও, বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে মডি কোহেন আজও এক উজ্জ্বল নাম।
