বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে সমালোচিত গভর্নর

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে আহসান এইচ মনসুর একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের নাম হয়ে থাকবেন। সাবেক এই গভর্নরের নেতৃত্বকালে ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অভিজ্ঞ হয়েছেন এক অস্বস্তিকর ও স্বৈরশাসিত পরিবেশের। বিদায়ের দুই সপ্তাহের মধ্যে ব্যাংকের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ও শান্তি ফিরেছে, যা ব্যাংকের কর্মকর্তারা ‘স্বস্তির নিশ্বাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণত শান্তিপ্রিয় ও পেশাদার। রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ব্যাংককে একটি ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন (কেপিআই)’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেইজন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে তারা দূরে থাকেন। তবে আহসান মনসুরের নেতৃত্বে তাঁরা একাধিকবার বাধ্য হয়েছেন কার্যকর প্রতিবাদে অংশ নিতে। তাঁর একগুঁয়েমি ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যাংকের পুরো পরিবার সোচ্চার হয়েছিল। বিদায়ের দিন এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক অতিরিক্ত পরিচালক পর্যন্ত সাবেক গভর্নরের গাড়িতে তুলে দিতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনসমূহের মধ্যে রয়েছে ৯টি ক্লাব ও সমিতি। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন, এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ক্লাব উল্লেখযোগ্য। এই সংগঠনগুলো সাবেক গভর্নরের চলে যাওয়ার পর স্বস্তি প্রকাশ করেছে। অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম বলেন,
“আহসান মনসুর কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের নয়, সমগ্র দেশের ব্যাংকিং সিস্টেমের ক্ষতি করেছেন।”

অতীতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা বিতর্কে জড়িয়েছেন। ১৯৯৬ সালে খোরশেদ আলমকে ঘেরাও করা হয়েছিল, এবং ২০০৯ সালে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বিদায়কালেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদ হয়েছিল। তবে এবারের ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আহসান মনসুরের সময়ে আন্দোলন হয়েছিল দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং স্বৈরশাসনের কারণে, যা আগের কোনো গভর্নরের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।

উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, সাবেক গভর্নর নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করেছেন, যা ব্যাংকের নীতির পরিপন্থী। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়ম, আর্থিক বিধি লঙ্ঘন ও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ রয়েছে। এই কারণে ব্যাংকের কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নিচের টেবিলটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিতর্কিত গভর্নরের কিছু মূল তথ্য সংক্ষেপে দেখানো হলো:

নামপদকালমূল অভিযোগবিদায়ের পর প্রতিক্রিয়াউল্লেখযোগ্য ঘটনা
আহসান এইচ মনসুরগভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংকস্বৈরশাসন, প্রশাসনিক অনিয়ম, স্বার্থসংঘাতকর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বস্তিগাড়িতে তুলে বের করা, ব্যয়বহুল পরামর্শক নিয়োগ
খোরশেদ আলমগভর্নর, ১৯৯২–১৯৯৬বেতনসংক্রান্ত অসংগতি প্রতিশ্রুতি অমান্যঘেরাও করা হয়েছিললুৎফর রহমান গভর্নরের আগমনকালীন অবরুদ্ধ
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদগভর্নর, ২০০৫–২০০৯ইনক্রিমেন্ট দাবিতে আন্দোলনঅন্য গেটে থেকে বের হনঅফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবাদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর স্বেচ্ছাচারিতা এবং একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে “সবচেয়ে সমালোচিত ও ধিক্কৃত গভর্নর” হিসেবে বিবেচিত হবেন।