ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্পের ক্রমবর্ধমান দংশন নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। মাসের প্রথম ২৭ দিনে দেশজুড়ে মোট দশটি হালকা থেকে মধ্যম মাত্রার কম্পন ধরা পড়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি একদিনে দুটি পৃথক কম্পন যুক্ত হলে এই সংখ্যা বেড়ে এগারোতে দাঁড়ায়।
সর্বশেষ কম্পনটি ঘটেছে ২৭ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১:৫২:২৯-এ, যার কেন্দ্রস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকা। কম্পনের প্রভাব ঢাকায়ও অনুভূত হয়েছিল এবং তা পূর্বে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানান, কম্পনের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৪, যা মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত।
ফেব্রুয়ারির ভূমিকম্প সংক্ষিপ্তসার
| তারিখ | এলাকা | রিখটার স্কেল অনুযায়ী মাত্রা | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| ১ ফেব্রুয়ারি | সিলেট | ৩.০ | হালকা কম্পন |
| ৩ ফেব্রুয়ারি | কালারোয়া, সাতক্ষীরা | ৪.১ | একাধিক কম্পন |
| ৩ ফেব্রুয়ারি | মিয়ানমার | ৫.৯ | বাংলাদেশে অনুভূত |
| ৩ ফেব্রুয়ারি | মিয়ানমার | ৫.২ | বাংলাদেশে অনুভূত |
| ৯ ফেব্রুয়ারি | সিলেট | ৩.২ | হালকা কম্পন |
| ১০ ফেব্রুয়ারি | সিলেট | ৩.৫ | হালকা কম্পন |
| ১৯ ফেব্রুয়ারি | চাটক, সুনামগঞ্জ | ৪.১ | মধ্যম কম্পন |
| ২৫ ফেব্রুয়ারি | মিয়ানমার | ৫.১ | রাতের দিকে অনুভূত |
| ২৬ ফেব্রুয়ারি | সিকিম, ভারত | ৩.৭ | বাংলাদেশে অনুভূত |
| ২৭ ফেব্রুয়ারি | আশাশুনি, সাতক্ষীরা | ৫.৪ | সর্বশেষ কম্পন |
বাংলাদেশে এটি নতুন নয়। গত বছরের নভেম্বরেও একাধিক ভূমিকম্প দেশজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। ২১ নভেম্বর নারসিংদীর মাধবদিহিতে ৫.৭ মাত্রার কম্পনে ১০ জনের মৃত্যু এবং ৬০০-এর বেশি আহত হয়। পরের দিনে আরও তিনটি কম্পন রেকর্ড করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানান যে, ভারত ও ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশের ভূগোলের কারণে দেশটি বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্য অতিসংবেদনশীল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ জিল্লুর রহমান বলেন:
“সাতক্ষীরা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, উত্তরের ও পূর্বের অঞ্চলগুলো উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। ঢাকা, যদিও মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, ঘনবসতিপূর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত নগরীকরণের কারণে মধ্যম মাত্রার কম্পন থেকেও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন যে, দেশের ক্ষুদ্র ও অজানা ফোল্ট লাইনগুলি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনাবিদরা ঢাকা ও চট্টগ্রামকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও নগর অঞ্চল
| শহর | মোট ভবন | সম্ভাব্য ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন | আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত ভবন | মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|
| ঢাকা | ২,১৪৬,০০০ | ৭২,০০০ | ১,৩৫,০০০ | ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বংসের সম্ভাবনা |
| চট্টগ্রাম | ৩৮২,১১১ | ২,৬৭,০০–৩,০৫,০০ | — | ৭০–৮০% ভবন ঝুঁকিপূর্ণ |
উপরের তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নির্মাণ নীতিমালা শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ নগর এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কমাতে নির্মাণ ও নগর পরিকল্পনায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। যথাযথ প্রস্তুতি নিলে মানুষের প্রাণরক্ষা ও অবকাঠামোগত ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব।
