বাংলাদেশের ব্যাংকে অস্বাভাবিক এক ঘটনা

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক সময়ে এক অস্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে—কোটিপতি অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু এসব অ্যাকাউন্টে জমা থাকা অর্থ দ্রুত কমছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে নতুন কোটিপতি হয়েছে হাজার হাজার মানুষ, কিন্তু ধনী শ্রেণি তাদের পুরোনো জমা অর্থ ব্যাপক হারে ব্যাংক থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।

ব্যাংক খাতের এ প্রবণতা বুঝতে হলে প্রথমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া সংখ্যাগুলো খেয়াল করতে হয়। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকে দেশে কোটিপতি হিসাব ছিল এক লাখ ২১ হাজার ৩৬২টি, যেখানে জুন প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ২৭ হাজার ৩৩৬টিতে। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে আরও প্রায় ছয় হাজার মানুষ কোটিপতি তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। এরপর জুন থেকে সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে আরও ৭৩৪টি নতুন কোটিপতি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। কাগজে-কলমে এ বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা উল্টো।

কেননা, কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেও তাদের অ্যাকাউন্টে জমা থাকা অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অর্থাৎ নতুন কোটিপতিরা ছোট অঙ্কের জমা নিয়ে তালিকায় যুক্ত হয়েছেন, আর ধনী শ্রেণির মানুষ ব্যাংকে অরক্ষিত মনে হওয়ায় বা আস্থাহীনতার কারণে বিপুল অঙ্কের অর্থ তুলে নিচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাতের সংকট, অনিয়ম, ঋণ খেলাপির ব্যাপকতা এবং আমানত রক্ষায় দুর্বল অবস্থান মানুষের আস্থায় চিড়া ধরিয়েছে। সাম্প্রতিক ডলারসংকট, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবে নগদ প্রবাহের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা বড়ো আমানতকারীদের আরও সতর্ক করেছে। ফলে অনেকে ব্যাংক থেকে বড়ো অঙ্কের অর্থ তুলে বিকল্প খাতে—যেমন স্বর্ণ, জমি, বিদেশে সম্পদ, বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন।

একই সময়ে দেখা যায়, ব্যাংক খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা তিন মাসে বেড়েছে প্রায় ৫৬ লাখ। নতুন হিসাব চালু হওয়া মানেই নতুন গ্রাহকের আগমন, যা ইতিবাচক। তাছাড়া সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত বেড়েছে ৩৪ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। তবে এই বৃদ্ধির বড়ো অংশই এসেছে সাধারণ ও মাঝারি গ্রাহকের ছোট অঙ্কের জমা থেকে। কোটিপতি শ্রেণিতে বরং আমানতের পরিমাণ কমেছে, যা অর্থনীতির গভীরে থাকা সমস্যাকে আরও স্পষ্ট করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ, কোটিপতি শ্রেণি হলো ব্যাংকের বড়ো আমানতদাতা, যারা তারল্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়া ভবিষ্যতে তারল্য সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে।

এ ছাড়া করনীতি, অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহারের চাপ, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা, পুঁজি পাচারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। যদি দ্রুত নীতিগত সংস্কার, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, এবং ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বাড়লেও প্রকৃত আমানত কমতে থাকবে, যা অর্থনীতির জন্য বিপদজনক।

সবশেষে বলা যায়, কোটিপতি বাড়া যেমন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত, তেমনি কোটিপতির আমানত কমা ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার একটি লাল সংকেত। এখন প্রশ্ন—সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কত দ্রুত এ সংকট মোকাবিলা করবে?