বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরে আশানুরূপ পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, আইএমএফের পূর্ণকালীন কর্মকর্তা আহসান এইচ মনসুরকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সুশীল সমাজ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা আশা করেছিলেন, তিনি দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও বিকাশমুখী পথে নিয়ে যাবেন। কিন্তু বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্ন প্রমাণিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি
গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের অর্থনীতি ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়, ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অনেক কারখানা বন্ধ হয় এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। প্রায় ১৮ মাসের কঠোর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পরও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
পাচার অর্থ ফেরতের অগ্রগতি:
| বছর | ঘোষিত সময় | বাস্তব অগ্রগতি | খরচ (কোটি টাকা) |
|---|---|---|---|
| ২০২৪ | ৬ মাস | ০% | কোটি কোটি টাকা |
| ২০২৫ | ৪–৫ বছর | ০% | খরচ বৃদ্ধি |
গভর্নর মনসুর ঘোষণা করেছিলেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা তার অগ্রাধিকার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর তিনি বলেছিলেন, ছয় মাসের মধ্যে কিছু টাকা ফেরত আনা সম্ভব হবে। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেন। এক বছর পর তিনি ঘোষণা পাল্টে জানালেন, প্রকৃতপক্ষে এটি চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে।
একই সময়ে, দেশের পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে গঠিত যৌথ তদন্ত কমিটিগুলো কার্যকর প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হয়। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষয় পায় এবং নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে পড়ে।
মুদ্রানীতি ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা
গভর্নরের মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। তিন দফায় নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার পৌঁছেছে ১৬–১৭ শতাংশে। এর ফলে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ কমেছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির।
মূল চ্যালেঞ্জসমূহ:
| চ্যালেঞ্জ | প্রভাব |
|---|---|
| উচ্চ নীতি সুদহার | ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ কমানো |
| মূল্যস্ফীতি | ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস |
| বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা | রপ্তানি হ্রাস (-১৪.২৫%) |
| অপর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ | শিল্প ও ব্যাংক খাতের অনিয়ম অব্যাহত |
সমালোচনা ও পরামর্শ
বেসরকারি গবেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান তাসকিন আহমেদ বলেছেন, সাবেক গভর্নরের নীতিতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব হয়নি। তারা নতুন সরকারের জন্য চারটি মূল খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন:
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
সুদের হার কমানো
টাকার মান নিয়ন্ত্রণ
দায়দেনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
সিপিডি এবং অন্যান্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই চারটি ক্ষেত্রেই সাবেক গভর্নর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। গভর্নরের নীতি এবং আইএমএফ নির্দেশনার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি সাধন করেছে।
