দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের পথচলা শুরু হয়েছে এক জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন বহুমুখী চাপের সম্মুখীন। এই সংকটময় মুহূর্তে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে মূলত সাতটি প্রধান অন্তরায়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মোকাবিলা করাই হবে সরকারের প্রধান পরীক্ষা।
Table of Contents
অর্থনীতির সাতটি প্রধান চ্যালেঞ্জ
সোমবার রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পুনরুজ্জীবন’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমানসহ বিশিষ্টি অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন। প্রতিবেদনে বর্ণিত সাতটি বড় চ্যালেঞ্জ নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
| চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্র | সংকটের প্রকৃতি ও প্রভাব |
| ১. সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ | লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট। |
| ২. রাজস্ব ও ঋণ ব্যবস্থাপনা | লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ। |
| ৩. ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা | খেলাপি ঋণের পাহাড় ও আর্থিক খাতে সুশাসনের চরম অভাব। |
| ৪. রপ্তানি বৈচিত্র্যের অভাব | শুধুমাত্র তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা। |
| ৫. বিনিয়োগ পরিবেশের অবনতি | বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। |
| ৬. জ্বালানি সংকট | গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাব। |
| ৭. কর্মসংস্থান ও দক্ষতা | শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে মানসম্মত জনশক্তির ঘাটতি। |
কাঠামোগত সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হোসেন জিল্লুর রহমান বর্তমান নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থার ‘শর্ট-টার্মিজম’ বা স্বল্পকালীন চিন্তা-ভাবনাকে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার কেবল সাময়িক সংকট মেটাতেই ব্যস্ত থাকে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে নজর কম। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবকে তিনি বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশীরা সমুদ্রের সম্পদ আহরণ করে ফেললেও বাংলাদেশ এখনো সেমিনারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
সুশাসন ও আমলাতন্ত্রের ভূমিকা
অর্থনৈতিক সুশাসনের অভাবকে দুর্নীতির চেয়েও বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো দাপ্তরিক অনুমোদন বা সেবা প্রদানে অহেতুক দেরি করাকে হোসেন জিল্লুর রহমান এক ধরনের ‘রাষ্ট্রীয় হয়রানি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমলাতন্ত্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া সরকারের জন্য একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ফরেনসিক অডিট ও স্বচ্ছতার দাবি
বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ রাষ্ট্রের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন: বিপিসি, পেট্রোবাংলা ও সরকারি ব্যাংক) ‘ফরেনসিক অডিট’ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত দেনা-পাওনা এবং আর্থিক স্বাস্থ্যের সঠিক চিত্র না জানলে কোনো সংস্কারই সফল হবে না। জনগণের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এবং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।
পরিশেষে, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে কি না। বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
