বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ হিসেবে উল্লেখ করায় ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ফের উত্তেজনা ছড়িয়েছে। এবার এই ক্ষোভ ফুটে উঠেছে কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে, যেখানে ফুটবলপ্রেমী ইস্টবেঙ্গল সমর্থকেরা ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ জানিয়ে বিষয়টিকে জাতীয় আলোচনায় পরিণত করেছেন।
গত ৬ আগস্ট দুর্গাপুর কাপে ইস্টবেঙ্গল বনাম নামধারী এফসির খেলায় সমর্থকেরা গ্যালারিতে একটি বিশাল ব্যানার উন্মোচন করেন, যেখানে লেখা ছিল—
‘ভারত স্বাধীন করতে সেদিন পরেছিলাম ফাঁসি,
মায়ের ভাষা বলছি বলে আজকে বাংলাদেশি।’
এই ব্যানার সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে পড়ে। তাতে উঠে আসে এক জোরালো বার্তা—যে ভাষার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রাণ উৎসর্গ করা হয়েছিল, আজ সেই ভাষাকেই বিদেশি বলে অপমান করা হচ্ছে।
এই প্রতিবাদের পেছনে রয়েছে দিল্লি পুলিশের সাম্প্রতিক একটি চিঠি। সেখানে দিল্লিস্থ বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তাকে দেওয়া চিঠিতে বাংলা ভাষাকে “বাংলাদেশি ভাষা” হিসেবে উল্লেখ করা হয় অনুবাদের প্রসঙ্গে। বিষয়টি জানাজানি হতেই পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই ঘটনায় কড়া আপত্তি জানানো হয়। দলনেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্সে (সাবেক টুইটার) লেখেন—
‘এ ধরনের শব্দচয়ন লজ্জাজনক, অপমানজনক, দেশবিরোধী এবং সংবিধানবিরোধী। এটা সমস্ত বাংলাভাষীর অপমান।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘দেখুন, কীভাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দিল্লি পুলিশ বাংলাকে বাংলাদেশি ভাষা হিসেবে বর্ণনা করছে!’
অন্যদিকে, বিজেপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বলেন— চিঠিতে অপমানের কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। বরং কিছু উপভাষা ও উচ্চারণভঙ্গি বোঝাতে “বাংলাদেশি” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যেগুলো অভিবাসন সংক্রান্ত প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক।
তবে কলকাতার ফুটবল মাঠে প্রতিবাদের ইতিহাস দীর্ঘ। এর আগেও ২০২০ সালে এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে এক ব্যানারে লেখা হয়েছিল—
‘রক্ত দিয়ে কেনা মাটি, কাগজ দিয়ে নয়।’
ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে উদ্বাস্তু, দেশভাগ ও শরণার্থী জীবনের সঙ্গে। অধিকাংশ সমর্থকের পূর্বপুরুষ পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুর সন্তান, যারা ভাষা ও পরিচয়ের লড়াইকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
এই কারণেই গ্যালারি হয়ে উঠেছে কেবল খেলার নয়, প্রতিবাদেরও মঞ্চ। এমনকি গত বছর এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায়ও ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান সমর্থকেরা একজোট হয়ে ন্যায়বিচার দাবি জানিয়েছিলেন।
বাংলা ভাষাকে ঘিরে এই সাম্প্রতিক ঘটনাও যেন এক নতুন ভাষা আন্দোলনের বার্তা বহন করছে, যেখানে প্রতিবাদের ভাষা রূপ নিচ্ছে গ্যালারির ব্যানারে, সমর্থকদের গর্জনে।