বাঁশির সুরে ভরা জীবন, মনে অপূর্ণতার ব্যথা

বাংলার মাটির গন্ধমাখা লোকসুর আর আত্মাকে ছুঁয়ে যাওয়া বাঁশির মায়াবী ধ্বনির এক অনন্য সাধক বারী সিদ্দিকী। আজ তাঁর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। সময়ের স্রোতে মানুষ এগিয়ে যায়, কিন্তু কিছু শিল্পী তাঁদের সুরে সময়কে স্থির করে রাখেন। বারী সিদ্দিকী ছিলেন তেমনই এক অনন্য নাম—যিনি বেঁচে থাকতে সম্মান পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের মনের গভীরে চাপা অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাসও রেখে গেছেন। তিনি চেয়েছিলেন আরও বড় পরিসরে প্রতিষ্ঠা পেতে; চেয়েছিলেন বাঁশির জন্যই তাঁর নাম উচ্চারিত হোক।

শৈশবের সংগীতময় পরিবেশ তাঁকে সুরের জগতে টেনে নেয়। মায়ের গান, অন্দরমহলের সুর, আর গ্রামীণ আবহের মরমী আচার—সব মিলিয়ে তাঁর মধ্যে তৈরি হয় গভীর সুরচেতনা। তবু বাঁশির সুর নিয়ে দীর্ঘ অনুশীলনের পরও তিনি কাঙ্ক্ষিত পরিচিতি পাননি। বরং অনেক সময় কটূক্তি সহ্য করতে হয়েছে। অথচ তাঁর বিশ্বাস ছিল—বাঁশিই তাঁর প্রকৃত পরিচয়। পরবর্তীতে যখন তাঁর গান দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করল, তখনও মনে তাঁকে তাড়া করত একটি প্রশ্ন—“এতো সাফল্যের মাঝেও বাঁশির জন্য কি মূল্যায়ন রইল?”

তাঁর সুর ও কণ্ঠে ছিল মানুষের প্রতি অনন্ত মমতা—‘মানুষ ধরো মানুষ ভজো’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘শুয়া চান পাখি’—এসব গান এখনও শ্রোতার মনে ছড়িয়ে দেয় একধরনের মরমী উষ্ণতা। হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হওয়ার পর তাঁর গান যেন নতুনভাবে জন্ম নেয়। গ্রামীণ দর্শন, আধ্যাত্মিকতা, ভালোবাসা—সবকিছু মিলিয়ে তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন এক ব্যতিক্রমী ধারার শিল্পী হিসেবে।

সুরকার হিসেবেও তাঁর ব্যস্ততা ছিল উল্লেখযোগ্য। দেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের বহু গানের পেছনে ছিল তাঁর সুরের ছোঁয়া। কিন্তু আত্মজিজ্ঞাসায় প্রায়শই তিনি ফিরে যেতেন তাঁর প্রথম প্রেম—বাঁশির কাছে, যার প্রতি প্রাপ্য সম্মান তিনি সবসময়ই প্রত্যাশা করতেন।

তাঁর স্মৃতিকে সামনে রেখে বারী সিদ্দিকী স্মৃতি পরিষদ আজ রামপুরায় আয়োজন করেছে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের। ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা সেখানে স্মরণ করবেন তাঁদের প্রিয় শিল্পীকে।
এনটিভিতে সকালে ‘আজ সকালের গান’–এ প্রিন্স আলমগীর পরিবেশন করবেন তাঁর বেশ কয়েকটি কালজয়ী গান। পাশাপাশি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে থাকছে বিশেষ স্মরণানুষ্ঠান, যেখানে গল্প, স্মৃতি ও প্রিয় সুরে আবারও ফিরে আসবেন বারী সিদ্দিকী—তাঁর নিজস্ব মায়াবী জগতে।