‘বহিরাগত’ প্রার্থী মানবে না তৃণমূল, নাকে খত দিয়ে দলত্যাগ

ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) আসনে বিএনপির নির্বাচনী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে নজিরবিহীন অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে যারা দলের দুঃসময়ে সক্রিয় ছিলেন, সেই স্থানীয় নেতাদের উপেক্ষা করে গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানকে মনোনয়ন দেওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে তৃণমূল। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত ২৫ ডিসেম্বর কালীগঞ্জ শহরের সোনালী ব্যাংকের পেছনে প্রকাশ্যে নাকে খত দিয়ে দল ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন সাকিব হোসেন নামে এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ঝিনাইদহের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

সাকিব হোসেন পেশায় একজন নিরাপত্তাকর্মী এবং দীর্ঘ সময় ধরে কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত। তিনি জানান, কালীগঞ্জ বিএনপিতে তিনজন প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় নেতা থাকার পরও হাইকমান্ডের এমন ‘অদূরদর্শী’ সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তার মতে, রাশেদ খান স্থানীয় রাজনীতির সাথে কখনও সম্পৃক্ত ছিলেন না এবং এই জনপদের মানুষের সুখ-দুঃখের সাথেও তার কোনো সম্পর্ক নেই। নিবেদিত কর্মীদের অবমূল্যায়ন করে এমন একজনকে ধানের শীষের দায়িত্ব দেওয়াকে তিনি দলের জন্য আত্মঘাতী হিসেবে দেখছেন।

তৃণমূলের এই ক্ষোভের প্রধান কারণগুলো নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো:

তৃণমূল কর্মীদের আপত্তির মূল কারণসমূহ

বিষয়ের ধরণবিস্তারিত বিবরণ
স্থানীয় নেতৃত্বের অভাবস্থানীয় তিনজন শক্তিশালী প্রার্থীকে উপেক্ষা করে বাইরের নেতাকে মনোনয়ন।
ব্যক্তি পরিচিতিপ্রার্থী রাশেদ খান এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত।
আদর্শিক দূরত্বগণঅধিকার পরিষদ থেকে আসা নেতার হাতে ধানের শীষ তুলে দেওয়া।
দুর্দিনের অবমূল্যায়নযারা দীর্ঘদিন জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তাদের প্রাপ্য মূল্যায়ন না করা।
ভোটারদের অনীহাস্থানীয় প্রার্থীদের সাথে ভোটারদের আত্মিক সম্পর্ক না থাকা।

সাকিব হোসেন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে গণমাধ্যমকে বলেন, “দলের দুঃসময়ে আমরা খেয়ে না খেয়ে রাজপথে ছিলাম। অথচ আজ যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাকে কালীগঞ্জের মানুষ চেনেও না। দল যেহেতু কর্মীদের মূল্যায়ন করেনি, তাই আমি নাকে খত দিয়ে ঘোষণা করছি—আমি আর বিএনপির রাজনীতিতে নেই। দল যদি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে, তবে আগামী নির্বাচনে আমার মতো হাজারো কর্মী ভোটকেন্দ্রে যাবে না।”

উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইলিয়াস রহমান মিঠু এই প্রসঙ্গে জানান, কালীগঞ্জের তৃণমূল বর্তমানে চরম হতাশায় নিমজ্জিত। স্থানীয় ভোটাররা তাদের চিরচেনা নেতাদের পরিবর্তে ‘বহিরাগত’ প্রার্থীকে গ্রহণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। সাকিবের মতো ত্যাগী কর্মীদের এই বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত মূলত দলের হাইকমান্ডের প্রতি তৃণমূলের একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, বিপদে-আপদে পাশে থাকা নেতাদের বঞ্চিত করার প্রভাব সরাসরি ব্যালট বক্সে পড়বে।

বর্তমানে ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন, সময় থাকতে এই আসনে মনোনয়ন পুনর্বিবেচনা করা না হলে নির্বাচনে এর বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাকিবের নাকে খত দেওয়ার এই ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির পদত্যাগ নয়, বরং এটি সারা দেশের তৃণমূলের ক্ষোভের একটি প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ।