চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় পারিবারিক জায়গাজমি নিয়ে সৃষ্ট শত্রুতার এক ভয়াবহ ও বিয়োগান্তক রূপ প্রত্যক্ষ করল এলাকাবাসী। বসতভিটার বিরোধকে কেন্দ্র করে রাগের বশবর্তী হয়ে নিজ বাড়িসহ আপন আত্মীয়দের ৪টি ঘরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন মো. মহিউদ্দিন (২৭) নামের এক যুবক। শনিবার (৩ জানুয়ারি) দুপুর ১টার দিকে বরুমছড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল হাকিম চৌকিদার বাড়িতে এই নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা অভিযুক্ত মহিউদ্দিনকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, মহিউদ্দিনের সাথে তার চাচাদের বসতভিটার সীমানা ও মালিকানা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে মনোমালিন্য চলছিল। সেই ক্ষোভ থেকে শনিবার দুপুরে তিনি বাজার থেকে কেরোসিন সংগ্রহ করেন এবং পরিকল্পিতভাবে প্রথমে নিজের বসতঘরে আগুন লাগিয়ে দেন। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের শিখা তীব্র হয়ে উঠলে তিনি একে একে তার চাচার ও অন্যান্য আত্মীয়দের ঘরেও কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। আগুনের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়ি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং আশপাশের মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা চালিয়েও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হলে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়।
আনোয়ারা ফায়ার সার্ভিসের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তবে ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা ৪টি পরিবারের স্বপ্ন ও শেষ সম্বল কেড়ে নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন শামসুর ইসলাম, মো. নুরুল ইসলাম, মো. আব্দুল আলিম ও মো. রহিম। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই অগ্নিকাণ্ডে তাদের কয়েক দশকের পরিশ্রমের ফল—নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার, আসবাবপত্র ও মূল্যবান কাগজপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ লক্ষ টাকা।
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
| ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি | ঘরের ধরণ | ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ | দাবিকৃত ক্ষতি (টাকা) |
| শামসুর ইসলাম | সেমিপাকা | আসবাব, ইলেকট্রনিক্স ও নগদ অর্থ | ১০,০০,০০০ |
| মো. নুরুল ইসলাম | কাঁচা (মাটি) | গৃহস্থালি সামগ্রী ও আসবাব | ৪,০০,০০০ |
| মো. আব্দুল আলিম | কাঁচা (মাটি) | ধান-চাল ও ঘরের সরঞ্জাম | ২,০০,০০০ |
| মো. রহিম | কাঁচা (মাটি) | ঘর ও পরিধেয় বস্ত্র | ২,০০,০০০ |
| মো. মহিউদ্দিন (নিজে) | কাঁচা (মাটি) | সম্পূর্ণ ঘর | ২,০০,০০০ |
ফায়ার সার্ভিসের সাব-অফিসার মো. আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডে একটি সেমিপাকা ঘর ও তিনটি মাটির ঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়েছে। তাদের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী অবকাঠামোগত ক্ষতি ৪ লক্ষ টাকা হলেও ঘরগুলোর ভেতর থেকে প্রায় ২০ লক্ষ টাকার সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী জানান, অভিযুক্ত যুবককে আটক করে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পারিবারিক বিরোধের জের ধরে তিনি এই কাজ করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শীতের এই দুপুরে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারগুলোর আহাজারিতে ওই এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
