বর্ষপঞ্জির শেষ প্রান্তে এসে বাংলাদেশের সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদহার আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে। আর্থিক খাতের ভেতরে বাড়তে থাকা চাপ, ব্যাংকগুলোর সতর্ক অবস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে মধ্যম ও তুলনামূলক দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বিলে সুদের হার বাড়ার প্রবণতা স্পষ্ট, যা বাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার প্রকাশিত সর্বশেষ নিলামের ফলাফলে দেখা যায়, স্বল্পমেয়াদি ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের কাট-অফ সুদহার অপরিবর্তিত থেকে ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশে স্থিতিশীল রয়েছে। এতে বোঝা যায়, স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। তবে মেয়াদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিত্র বদলে যাচ্ছে। ১৮২ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার আগের ১০ দশমিক ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশে। একইভাবে ৩৬৪ দিনের বিলের সুদহারও সামান্য হলেও বৃদ্ধি পেয়ে ১০ দশমিক ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই নিলামের মাধ্যমে সরকার মোট ৭০ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহ করেছে, যা চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির একটি অংশ পূরণে ব্যবহৃত হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ট্রেজারি বিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বিশেষ করে অর্থবছরের শেষ ভাগে যখন ব্যয়চাপ বাড়ে, তখন এই বিলগুলোর ভূমিকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ৩১ ডিসেম্বর বর্ষশেষ হিসাব সমাপনী সামনে রেখে অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকই দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বিলে অর্থ আটকে রাখতে চাইছে না। হিসাবনিকাশের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাংকগুলো এই সময়ে তারল্য ধরে রাখতে আগ্রহী এবং ব্যালান্স শিটকে শক্তিশালী দেখাতে চায়। ফলে ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিনের বিলের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সুদের হারে।
বর্ষশেষের এই চাপের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক ব্যাংকই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। সম্ভাব্য রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বদলে স্বল্পমেয়াদি ও অধিক তরল খাতে ঝুঁকছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে আগামী কয়েক সপ্তাহেও ট্রেজারি বিলের সুদহার ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। তারল্য পরিস্থিতিতে বড় ধরনের স্বস্তি না এলে বা ব্যাংকগুলোর আস্থা দ্রুত ফিরে না এলে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বিলের সুদহার উচ্চ পর্যায়েই থাকতে পারে।
বর্তমানে সরকার চার ধরনের ট্রেজারি বিল—১৪ দিন, ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদে—নিয়মিত নিলামের মাধ্যমে বাজারে ছাড়ছে। এর পাশাপাশি দুই বছর থেকে শুরু করে বিশ বছর মেয়াদি পাঁচ ধরনের সরকারি বন্ডও সক্রিয়ভাবে লেনদেন হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বর্ষশেষের আর্থিক চাপ, নির্বাচনজনিত সতর্কতা এবং ব্যাংকগুলোর সুশৃঙ্খল তারল্য ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত প্রভাবেই ট্রেজারি বিলের সুদহার বৃদ্ধির এই ধারা দেখা যাচ্ছে, যা সরকারের অর্থায়ন প্রয়োজন ও ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্যকে নতুন করে সামনে আনছে।