বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল,বাড়ছে বিদ্যুৎ সংকট

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায় অবস্থিত কয়লাভিত্তিক বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। একাধিক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রোববার (১৮ জানুয়ারি) থেকে কেন্দ্রটির সব ইউনিট অচল হয়ে পড়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প খাত—উভয়ের জন্যই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের উত্তরাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রটির তিনটি ইউনিট পর্যায়ক্রমে যান্ত্রিক সমস্যায় পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ইউনিটটি হলো ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় ইউনিট, যা গত বছরের ১ নভেম্বর থেকেই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হারবিন ইন্টারন্যাশনালের তত্ত্বাবধানে এই ইউনিটের মেরামতকাজ চলমান রয়েছে।

অন্যদিকে, ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় ইউনিটটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ২০২০ সালের নভেম্বর মাস থেকে এটি উৎপাদনের বাইরে রয়েছে, যা কেন্দ্রটির সামগ্রিক সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ ধাক্কা আসে প্রথম ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর প্রথম ইউনিটটি বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ১৫ দিন মেরামত শেষে ১৪ জানুয়ারি পুনরায় চালু করা হলেও মাত্র চার দিনের মাথায় আবারও সেটি বন্ধ হয়ে যায়।

বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, প্রথম ইউনিটের বয়লারের সম্পূর্ণ টিউব ফেটে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। তিনি বলেন, প্রায় এক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বয়লারটি সম্পূর্ণভাবে ঠান্ডা হলে তবেই মেরামতকাজ শুরু করা সম্ভব হবে। ফলে কবে নাগাদ উৎপাদন পুনরায় শুরু হবে, তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তিনি আরও জানান, প্রথম ইউনিটটি প্রায় ২০ বছর পুরোনো হওয়ায় প্রতি পাঁচ বছর পরপর বড় ধরনের মেরামতের প্রয়োজন পড়ে। বয়সজনিত কারণে যন্ত্রপাতির সক্ষমতা কমে আসায় এ ধরনের ত্রুটি ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে।

বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিটভিত্তিক বর্তমান অবস্থা

ইউনিট নম্বরক্ষমতা (মেগাওয়াট)বর্তমান অবস্থাবন্ধ থাকার কারণ
প্রথম ইউনিট১২৫বন্ধবয়লারের টিউব ফেটে যাওয়া
দ্বিতীয় ইউনিট১২৫বন্ধ (২০২০ থেকে)দীর্ঘমেয়াদি যান্ত্রিক সমস্যা
তৃতীয় ইউনিট২৭৫বন্ধ (১ নভেম্বর থেকে)যান্ত্রিক ত্রুটি, মেরামত চলমান

প্রধান প্রকৌশলী আরও বলেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে সরবরাহকৃত কয়লার ওপর নির্ভর করেই এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পরিচালনা করে। চীন থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পৌঁছালে তৃতীয় ইউনিটটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সবকিছু অনুকূলে থাকলে আগামী মার্চ মাস নাগাদ অন্তত একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও পুরোনো অবকাঠামো ও সময়মতো আধুনিকায়নের অভাবে বারবার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।