বগুড়ার রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সাতমাথা এলাকায় সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এক নজিরবিহীন ও রহস্যময় ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয়ে হঠাৎ জাতীয় পতাকা উড়তে দেখা গেছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তালাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত থাকা এই ভবনে দীর্ঘ দেড় বছর পর এমন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক কৌতূহল ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সাতমাথা সংলগ্ন টেম্পল রোডের ওই ভবনের দোতলায় একটি প্লাস্টিকের পাইপের মাথায় জাতীয় পতাকাটি উড়তে দেখা যায়। ভবনটির এই অংশে আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয় এবং তার ঠিক পাশেই ছাত্র ইউনিয়নের জেলা কমিটির কার্যালয় অবস্থিত। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ভবনটি কার্যত জনশূন্য থাকলেও হঠাৎ সেখানে জাতীয় পতাকার উপস্থিতি সবার নজর কাড়ে। তবে রাত সাড়ে ৮টার আগেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর রহস্যজনকভাবে পতাকাটি সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
ভবনটির পাশেই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বগুড়া জেলা শাখার কার্যালয়। সিপিবির জেলা সভাপতি আমিনুল ফরিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “সকালে আমাদের দলীয় কর্মসূচি ছিল এবং বিকেল ৪টা পর্যন্ত আমরা অফিসেই ছিলাম। তখন পর্যন্ত বিশেষ কিছু নজরে আসেনি। তবে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফিরে এসে দেখি সেখানে জাতীয় পতাকা লাগানো হয়েছে। ধারণা করছি, সবার অগোচরে কেউ এটি লাগিয়ে দ্রুত সটকে পড়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ও দায় স্বীকার
পতাকা উত্তোলনের কিছু সময় পর আওয়ামী লীগের বগুড়া জেলা শাখার ফেসবুক পেজ থেকে একটি পোস্ট দিয়ে এই ঘটনার দায় স্বীকার করা হয়। পোস্টে উল্লেখ করা হয় যে, দলীয় নেতাকর্মীরাই কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন। সেখানে লেখা হয়, “বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। আমাদের কেউ দাবায়া রাখতে পারবা না।” এই পোস্টটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
ঘটনার একটি সংক্ষিপ্ত সময়রেখা নিচে তুলে ধরা হলো:
| সময় | ঘটনার বিবরণ | মন্তব্য |
| সকাল ১০টা – বিকেল ৪টা | সিপিবির কর্মসূচি চলছিল। | তখন পর্যন্ত কোনো পতাকা দেখা যায়নি। |
| বিকেল ৪:৩০ মিনিট | পতাকা প্রথম দৃশ্যমান হয়। | স্থানীয়রা প্লাস্টিকের পাইপে পতাকা দেখেন। |
| সন্ধ্যা ৬:৩০ – ৭:০০ টা | সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট। | দলীয় পেজ থেকে দায় স্বীকার করা হয়। |
| রাত ৮:৩০ মিনিট | পতাকা অদৃশ্য হয়। | কে বা কারা সরিয়ে নিয়েছে তা অস্পষ্ট। |
প্রশাসনের অবস্থান ও নিরাপত্তা শঙ্কা
বগুড়া জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া মুখপাত্র) মো. আতাউর রহমান জানিয়েছেন, পতাকা উত্তোলনের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে পুলিশের নজরে ছিল না। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং এই ঘটনার পেছনে কোনো উস্কানি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘ সময় পর এটি ছিল নেতাকর্মীদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার একটি প্রতীকী প্রচেষ্টা। তবে প্রকাশ্য দিবালোকে শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকায় এমন ঘটনা ঘটায় স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এমন পাল্টাপাল্টি কর্মকাণ্ডে সাতমাথা এলাকায় পুনরায় রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করছে।
