বকেয়া পরিশোধে বন্ড ইস্যুর প্রস্তাব বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের

দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো এবং আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বকেয়া বিল পরিশোধের জোরালো দাবি জানিয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ)। সোমবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি জানায়, নগদ অর্থ সংকটে থাকলে সরকার প্রয়োজনে বন্ড ইস্যু করে এই বকেয়া সমন্বয় করতে পারে। তাদের মতে, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকার বন্ড ছেড়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল, যার ফলে গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেনি। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছেও তারা অনুরূপ পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছে।

আর্থিক সংকট ও বকেয়ার প্রভাব

বিআইপিপিএ-এর নেতারা অভিযোগ করেন যে, চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করার কথা থাকলেও বর্তমানে তা ১৮০ থেকে ২৭০ দিন পর্যন্ত বকেয়া থাকছে। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল অংকের এই বকেয়া জমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পক্ষে নতুন করে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ব্যাংক থেকে ঋণপত্র বা এলসি (LC) খোলা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মজুত থাকা জ্বালানি দিয়ে আগামী ৭ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে, তবে এর পর জ্বালানি সংকটে অনেক কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো:

সক্ষমতার বিবরণমেগাওয়াট (MW)মন্তবব্য
মোট স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা২৮,০০০+তাত্ত্বিক সক্ষমতা
গ্যাস সংকটে অব্যবহৃত সক্ষমতা৬,০০০গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ
রক্ষণাবেক্ষণ জনিত বন্ধ১,৬২৬নিয়মিত মেরামতের আওতায়
প্রকৃত কার্যকর উৎপাদন সক্ষমতা১৮,৬২৭সর্বোচ্চ চাহিদার সময় প্রাপ্য
বকেয়া বিলের পরিমাণ১৪,০০০ কোটি টাকাবেসরকারি খাতের পাওনা

উৎপাদন খরচ ও ভর্তুকির চাপ

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ছয় বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি খরচ ৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ৫৫ শতাংশ। এর বিপরীতে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য সেভাবে বাড়ানো হয়নি। বর্তমানে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৭০ শতাংশই আবাসিক, বাণিজ্যিক ও কৃষি খাতে ব্যবহৃত হয়, যেখানে সরকারের ভর্তুকি অনেক বেশি। ফলে যত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে, সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ ততটাই বাড়ছে। এই সংকট নিরসনে বিআইপিপিএ জ্বালানি তেলের ওপর ৩৪ শতাংশ এবং এলএনজি আমদানিতে ২২ শতাংশ শুল্ক সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

গ্যাস সংকট ও বিকল্প জ্বালানি

বিআইপিপিএ সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে চাইলেই সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোই এখন বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল ভরসা। তবে অর্থের অভাবে তেল আমদানি ব্যাহত হলে দেশ বড় ধরনের লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে পারে।

বিআইপিপিএ-এর সাবেক সভাপতি ইমরান করিমের মতে, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাই আসন্ন সংকট মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত বকেয়া পরিশোধের রোডম্যাপ তৈরি এবং শুল্ক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।