ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্র এলাকায় মোবাইল ফোন বহনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জারি করা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণ ভোটারদের মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করলে নির্বাচন কমিশন ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এ ঘোষণা দেন। নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে যে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ মিটারের মধ্যে কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। তিনি দাবি করেন, এই বিধিনিষেধ ভোটারদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী এবং তা অবিলম্বে সংশোধন করা উচিত। “আজ সন্ধ্যার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হলে আগামীকাল নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করা হবে,”—বলেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন যদি পক্ষপাতমূলক আচরণ করে, তবে অতীতে সমালোচিত ‘ফ্যাসিস্ট আমলের’ নির্বাচন কমিশনের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাঁর ভাষায়, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে কমিশনকে সব দলের প্রতি সমান আচরণ করতে হবে এবং ভোটারদের প্রতি আস্থাশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক গণভোট উপলক্ষে গত রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে একটি নির্দেশনা পাঠান। সেখানে বলা হয়, ভোটগ্রহণের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণভাবে কেউ মোবাইল ফোন বহন করতে পারবেন না। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, গোপন ব্যালটের সুরক্ষা, ভোট কেনাবেচা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ছবি বা ভিডিও ধারণ রোধ এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবেন। নিচে বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | নির্দেশনা |
|---|---|
| নিষিদ্ধ এলাকা | ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধ |
| সাধারণ ভোটার | মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ |
| প্রিসাইডিং অফিসার | নিষেধাজ্ঞার বাইরে |
| পুলিশ ইনচার্জ | নিষেধাজ্ঞার বাইরে |
| ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ ব্যবহারকারী নির্ধারিত আনসার/ভিডিপি সদস্য (২ জন) | নিষেধাজ্ঞার বাইরে |
| কার্যকর তারিখ | ১২ ফেব্রুয়ারি (ভোটের দিন) |
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধকরণ নতুন নয়; অতীতেও বিভিন্ন দেশে এবং বাংলাদেশেও আংশিক বা পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তবে ৪০০ গজ ব্যাসার্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর ও প্রয়োগযোগ্য হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষত নগর এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে এই সীমা নির্ধারণ প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। একদিকে নির্বাচন কমিশন বলছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য; অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো আশঙ্কা করছে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ভোটার উপস্থিতি ও স্বচ্ছতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সার্বিকভাবে, নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার এই টানাপোড়েন আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন তাদের অবস্থানে অনড় থাকে নাকি রাজনৈতিক চাপের মুখে বিধিনিষেধে কোনো সংশোধন আনে।
