রাফায়েলা পিমেন্তা কখনো সবুজ ঘাসে দৌড়ে গোল করেননি, ডাগআউটে দাঁড়িয়ে কৌশল সাজাননি কিংবা দর্শকের উল্লাসে ভেসে যাননি। তবু আধুনিক ফুটবলের ক্ষমতার কাঠামোয় তাঁর অবস্থান শীর্ষ সারিতেই। ব্রাজিলীয় এই নারী এজেন্টই ২০২৬ সালে ফোর্বস প্রকাশিত ‘ফিফটি ওভার ফিফটি’ তালিকায় স্থান পাওয়া একমাত্র ফুটবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব। প্রতি বছর জানুয়ারিতে অসাধারণ প্রভাব, নেতৃত্ব ও মর্যাদার অধিকারী ৫০ জন নারীর নাম প্রকাশ করে ফোর্বস—যাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অন্যদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সেই তালিকায় অস্কারজয়ী অভিনেত্রী পেনেলোপে ক্রুজ কিংবা ব্রিটেনের প্রথম নারী আর্চবিশপ ডেম সারা মুলালির সঙ্গে একই কাতারে উঠে এসেছে রাফায়েলা পিমেন্তার নাম।
৫৩ বছর বয়সী পিমেন্তাকে বলা হয় ফুটবলের প্রথম নারী ‘সুপার এজেন্ট’। তাঁর অধীনে থাকা খেলোয়াড় ও কোচদের তালিকা চোখ ধাঁধানো। ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড, লিভারপুলের কোচ আর্নে স্লট কিংবা মাত্র ১৭ বছর বয়সী মেক্সিকান প্রতিভা গিলবার্তো মোরো—সবাই তাঁর প্রতিনিধিত্বে রয়েছেন। খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা, দলবদল আলোচনায় দর-কষাকষি, আইনি ও বাণিজ্যিক দিক সামলানো—সব মিলিয়ে ফুটবলের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গাগুলোর একটিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলেছেন।
নিচের টেবিলে সংক্ষেপে পিমেন্তার পেশাগত পরিচয় তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নাম | রাফায়েলা পিমেন্তা |
| বয়স | ৫৩ বছর |
| দেশ | ব্রাজিল |
| পেশা | ফুটবল এজেন্ট |
| উল্লেখযোগ্য তালিকা | ফোর্বস ‘ফিফটি ওভার ফিফটি’ (২০২৬) |
| পরিচিত ক্লায়েন্ট | আর্লিং হলান্ড, আর্নে স্লট, গিলবার্তো মোরো |
| বিশেষ পরিচিতি | ফুটবলের প্রথম নারী ‘সুপার এজেন্ট’ |
সম্প্রতি বিবিসি স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিমেন্তা বর্তমান দলবদল বাজার নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, আধুনিক ফুটবলে ক্ষমতার ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্লাবগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। খেলোয়াড়েরা অনেক সময় পরিস্থিতির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। পিমেন্তার ভাষায়, দলবদল ব্যবস্থার প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেখানে ভারসাম্য না থাকলে মানবিক দিকটি হারিয়ে যায়। প্রতিটি ট্রান্সফার উইন্ডোর শেষে এমন কেউ না কেউ থাকেই, যে যেতে চেয়েছিল, যাওয়ার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু কয়েক লাখ বা কয়েক মিলিয়ন পাউন্ডের ব্যবধানে আটকে যায়।
তিনি স্মরণ করেন, আগের দিনের ফুটবল ছিল তুলনামূলকভাবে মানবিক। ক্লাব মালিক বা পরিচালকদের সঙ্গে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল, আলোচনার জায়গা ছিল। এখন ফুটবল পুরোপুরি ব্যবসায় রূপ নিয়েছে; খেলোয়াড়কে দেখা হচ্ছে কেবল সম্পদ হিসেবে। অথচ মানুষ আর সম্পদের মধ্যে পার্থক্য না বুঝলে এই খেলাটির আত্মাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমনটাই মনে করেন পিমেন্তা।
দলবদল প্রক্রিয়ার জটিলতা নিয়েও কথা বলেন তিনি। একসময় দরজা বন্ধ করে টানা ১৮ ঘণ্টা আলোচনায় বসে চুক্তি সম্পন্ন করা যেত। আজকের দিনে সেটা প্রায় অসম্ভব। শ্রম আইন, করব্যবস্থা, স্থানীয় বিধিনিষেধ—সবকিছু মিলিয়ে খেলোয়াড়েরা এখন ছোট ছোট কোম্পানির মতো পরিচালিত হয়। মাঠের বাইরের সুযোগ, স্পনসরশিপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব মিলিয়ে চাপ বহুগুণ বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে হলান্ডের ইউটিউব চ্যানেলের কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে তাঁর অনুসারী সংখ্যা ১২ লাখেরও বেশি।
পিমেন্তার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল আলোচিত এজেন্ট মিনা রাইওলার সঙ্গে কাজ করে। রাইওলার মৃত্যুর পর অনেকেই তাঁকে উত্তরসূরি মনে করলেও পিমেন্তা নিজেকে বরাবরই স্বাধীন চিন্তার মানুষ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি প্রয়োজনে রাইওলাকে ‘না’ বলতে পেরেছিলেন। সেই পেশাগত সম্পর্ক টিকে ছিল প্রায় ৩৫ বছর।
নারী হওয়ার কারণে পথটা সহজ ছিল না। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর উপস্থিতি দীর্ঘদিন সীমিত ছিল বলে মনে করেন তিনি। আজ পরিস্থিতি বদলাচ্ছে, কিন্তু লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত পুরোপুরি দূর হয়নি। স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি লুইস রুবিয়ালেসের ঘটনায় তাঁর ক্ষোভ স্পষ্ট—ঘটনার চেয়েও ভয়ংকর ছিল সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া।
সবশেষে ফুটবল অঙ্গনে থাকা ও আসতে চাওয়া নারীদের উদ্দেশে পিমেন্তার বার্তা স্পষ্ট ও দৃঢ়—নির্যাতন বা বৈষম্য কখনো মেনে নেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, এখন তাঁর লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েদের জন্য, যেন তারা একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য না হয়।