১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছিল যা বদলে দিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র। সেই প্রস্তাব অনুসারেই আজকের ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম। কিন্তু একই প্রস্তাবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকলেও দীর্ঘ সাত দশকেও সেই রাষ্ট্রটি আলোর মুখ দেখেনি। ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বাধীনতা আজও এক রক্তাক্ত অধ্যায়।
Table of Contents
বিভক্তির ছক: তিন মিনিটেই ভাগ্য নির্ধারণ
১৯৪৭ সালের সেই দিনটিতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করার বিতর্কিত ‘প্রস্তাব ১৮১’ গৃহীত হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটি জাতির ভাগ্য নির্ধারণী এই প্রস্তাবটি পাস হয়েছিল মাত্র তিন মিনিটেরও কম সময়ের এক ভোটাভুটিতে।
সে সময় ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে প্রায় ১৩ লাখ আরব ফিলিস্তিনির বাস ছিল, যার বিপরীতে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬ লাখ। জনসংখ্যার এই বিশাল ব্যবধান সত্ত্বেও জাতিসংঘের বিভক্তি পরিকল্পনায়:
- ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য: বরাদ্দ করা হয় মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৫৪ শতাংশ (১৪ হাজার বর্গকিলোমিটার)।
- আরব ফিলিস্তিনিদের জন্য: বরাদ্দ হয় মাত্র ৪৫ শতাংশ ভূমি (সাড়ে ১১ হাজার বর্গকিলোমিটার), যা ছিল তিনটি বিচ্ছিন্ন এলাকা।
- জেরুজালেম: এই পবিত্র শহর ও এর আশপাশের এলাকাকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল (Corpus Separatum) হিসেবে রাখার প্রস্তাব করা হয়।
১৯৪৮ সালের যুদ্ধ ও ‘নাকবা’ (বিপর্যয়)
১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষিত হয়। এর পরপরই প্রতিবাদী প্রতিবেশী চারটি আরব দেশ (মিশর, জর্ডান, সিরিয়া ও ইরাক) একযোগে ইসরায়েল আক্রমণ করে। যুদ্ধে আরবরা পরাজিত হয় এবং শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, যাকে তারা বলে ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়।
এই যুদ্ধের ফলে:
- প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত হয়ে শরণার্থী হন।
- জাতিসংঘের প্রস্তাবিত সীমানা ছাড়িয়ে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের প্রায় ৭৭ শতাংশ ভূমি দখল করে নেয়।
- জর্ডান পশ্চিম তীর এবং মিশর গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধ ও দখলদারির নতুন মাত্রা
১৯৬৭ সালের ‘ছয় দিনের যুদ্ধে’ (Six-Day War) ইসরায়েল একযোগে গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। এরপর থেকেই শুরু হয় অবৈধ বসতি স্থাপন। হাজার হাজার হেক্টর জমি দখল করে ইহুদি বসতি স্থাপন করা হতে থাকে, যা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ।
শান্তি আলোচনা ও ওসলো চুক্তি
দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৯০-এর দশকে একটি আশার আলো দেখা দিয়েছিল। ১৯৯৩ সালের ওসলো শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (PLO) এবং ইসরায়েল একে অপরকে স্বীকৃতি দেয়। কথা ছিল পাঁচ বছরের মধ্যে একটি দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান (Two-State Solution) আসবে। কিন্তু ইসরায়েলি কট্টরপন্থীদের বিরোধ এবং একের পর এক নতুন বসতি স্থাপনের কারণে সেই শান্তি প্রক্রিয়া কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতি: কেন অধরা ফিলিস্তিন?
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া তো দূরের কথা, মানচিত্রে এর অস্তিত্বই সংকুচিত হয়ে আসছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- অবৈধ বসতি স্থাপন: পশ্চিম তীরে বর্তমানে প্রায় ৫ থেকে ৭ লাখ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী বাস করছে, যা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ভৌগোলিক সম্ভাবনাকে নষ্ট করছে।
- জেরুজালেম বিতর্ক: ফিলিস্তিনিরা তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমকে চায়, কিন্তু ইসরায়েল পুরো শহরটিকে তাদের অবিভাজ্য রাজধানী বলে দাবি করে।
- আন্তর্জাতিক রাজনীতি: বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা এবং ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন ফিলিস্তিন ইস্যুটিকে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখেছে।
১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘ যে প্রতিশ্রুতি ফিলিস্তিনিদের দিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন আজ সময়ের দাবি। বর্তমানে বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, পূর্ণ সার্বভৌমত্ব এবং সীমানার ওপর নিয়ন্ত্রণ আজও মেলেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই দীর্ঘস্থায়ী অবিচারের অবসান ঘটাতে কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্ষত কোনোদিনও শুকাবে না।
