গালফ অব ফিনল্যান্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন টেলিযোগাযোগ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়ার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বিস্তৃত তদন্ত শুরু করেছে। উত্তর ইউরোপের এই কৌশলগত জলপথটি নর্ডিক ও বাল্টিক অঞ্চলকে সংযুক্ত করে এবং সমুদ্রতলে বিদ্যুৎ লাইন, ডেটা কেবল ও জ্বালানি পাইপলাইনের ঘন উপস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। সাম্প্রতিক এই ঘটনা ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বুধবার ভোরে হেলসিঙ্কি ও তাল্লিনের মধ্যবর্তী কেবল রুটে ত্রুটি শনাক্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গেই উভয় দেশের নৌ কর্তৃপক্ষ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং অপরাধ তদন্ত সংস্থাগুলো ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে। ফিনল্যান্ডের বর্ডার গার্ড নিশ্চিত করেছে যে সন্দেহভাজন একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ফিনল্যান্ডের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের ভেতরে নোঙর অবস্থায় আটক করে তল্লাশি চালানো হয়।
প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজটি দীর্ঘ সময় ধরে নোঙর টেনে চলছিল। এই ধরনের কর্মকাণ্ড সমুদ্রতলের কেবল ও পাইপলাইনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এরই প্রেক্ষিতে হেলসিঙ্কি পুলিশ ‘গুরুতর অপরাধমূলক ক্ষতি’, ‘ক্ষতির চেষ্টা’ এবং ‘টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় মারাত্মক হস্তক্ষেপ’-এর অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কেবলটির মালিক ফিনল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম প্রতিষ্ঠান এলিসা। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কেবলটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্ডারওয়াটার অবকাঠামো হিসেবে চিহ্নিত। যদিও ক্ষতির সুনির্দিষ্ট স্থানটি এস্তোনিয়ার অর্থনৈতিক জলসীমার মধ্যে, তবুও সীমান্ত অতিক্রমকারী এই নেটওয়ার্কের কারণে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখা হচ্ছে। এলিসার ভাষ্য অনুযায়ী, বিকল্প সংযোগ ও রিডানডেন্সি ব্যবস্থার কারণে গ্রাহকসেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি।
তদন্তের আওতায় থাকা জাহাজটি ‘ফিটবার্গ’, যা সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিনসের পতাকাবাহী। জাহাজটি রাশিয়া থেকে ইসরায়েলের পথে ছিল বলে জানা গেছে। ১৪ সদস্যের নাবিকদলের মধ্যে রাশিয়া, জর্জিয়া, আজারবাইজান ও কাজাখস্তানের নাগরিক রয়েছেন এবং সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। ফিনল্যান্ডের জাতীয় পুলিশ কমিশনার ইল্কা কোসকিমাকি স্পষ্ট করেছেন, এই পর্যায়ে কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ফিনল্যান্ড সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় সতর্ক রয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়লে কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর বাল্টিক সাগর অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ নেওয়ায় সাবমেরিন কেবল ও পাইপলাইনের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ফলে এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়।
এর আগেও ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ফিনল্যান্ড–এস্তোনিয়া রুটে কেবল ক্ষতির ঘটনায় তেলবাহী জাহাজ ‘ইগল এস’-এর ক্যাপ্টেনসহ তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা ওই জাহাজকে রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ হিসেবে উল্লেখ করলেও মস্কো তা অস্বীকার করে। একই সময়ে সুইডিশ অপারেটর আরেলিয়ন আরেকটি কেবল ক্ষতির কথা জানায়, যার মেরামত আবহাওয়া অনুকূলে এলে শুরু হওয়ার কথা।
এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো ইউরোপজুড়ে সমুদ্রতলের অবকাঠামো নজরদারি জোরদার, কঠোর নৌ-নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত সুরক্ষা ব্যবস্থার দাবি আরও জোরালো করে তুলেছে।
বাল্টিক অঞ্চলে সাম্প্রতিক সাবমেরিন কেবল ঘটনা
| তারিখ | কেবল মালিক | অবস্থান | সন্দেহভাজন জাহাজ | সেবায় প্রভাব |
|---|---|---|---|---|
| বুধবার | এলিসা (ফিনল্যান্ড) | গালফ অব ফিনল্যান্ড (এস্তোনিয়ার ইইজেড) | ফিটবার্গ | উল্লেখযোগ্য প্রভাব নেই |
| মঙ্গল–বুধবার | আরেলিয়ন (সুইডেন) | গালফ অব ফিনল্যান্ড / বাল্টিক সাগর | তদন্তাধীন | সীমিত বিঘ্ন |
| ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪ | একাধিক অপারেটর | ফিনল্যান্ড–এস্তোনিয়া রুট | ইগল এস | আংশিক বিঘ্ন |
সব মিলিয়ে, এসব ঘটনা ক্রমবর্ধমান জটিল নিরাপত্তা বাস্তবতায় ইউরোপের সাবমেরিন অবকাঠামো সুরক্ষার জরুরি প্রয়োজনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।
