ফরিদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজারসংলগ্ন ময়রাপট্টি এলাকায় কুমার নদের ওপর একটি স্থায়ী পাকা সেতুর অভাব যেন শহরের দীর্ঘদিনের এক অব্যক্ত বেদনা। প্রায় ৮০ বছর ধরে এখানে একটি অস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু দিয়েই চলাচল করছে হাজার হাজার মানুষ, শত শত যানবাহন এবং কোটি টাকার পণ্য। স্বাধীনতার বহু দশক পেরিয়ে গেলেও শহরের কেন্দ্রস্থলে এমন গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে স্থায়ী অবকাঠামো না থাকা ফরিদপুরবাসীর জন্য গভীর হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এই বেইলি সেতুটি হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজার, তিতুমীর বাজার ও বৃহত্তর নিউ মার্কেট—এই তিনটি প্রধান বাণিজ্যিক এলাকার একমাত্র সরাসরি সংযোগ। প্রতিদিন এই সেতু দিয়েই যাতায়াত করে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক। একই সঙ্গে এখান দিয়েই পরিবাহিত হয় বিপুল পরিমাণ পণ্যসামগ্রী, যা ফরিদপুর শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখছে।
তিন বাজারের ভরসা, এক ঝুঁকিপূর্ণ সেতু
শহরের অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি কার্যত এই একটি সেতুর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সেতুটি আকারে সংকীর্ণ, ধারণক্ষমতায় সীমিত এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত চাপের কারণে প্রায়ই সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট, ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এখান থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও তার কোনো দৃশ্যমান প্রতিফলন অবকাঠামোগত উন্নয়নে দেখা যায় না।
নগর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে একটি আধুনিক, প্রশস্ত ও পরিকল্পিত পাকা সেতু নির্মাণ করা হলে অন্তত ৫০ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হতো এবং শহরের যানজট প্রায় ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারত।
লোক দেখানো সংস্কার, স্থায়ী সমাধান নেই
ফরিদপুরের সমাজসেবক ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মাহবুবুল হাসান পিংকু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বছরের পর বছর বেইলি সেতু মেরামতের নামে লোক দেখানো কাজই চলছে। প্রতিবছর ৫০–৬০ লাখ টাকা, কখনো তারও বেশি ব্যয়ের কথা বলা হয়। অথচ সেই অর্থ দিয়ে স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এতদিনে সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হয়ে যেত।
শরীয়তুল্লাহ বাজারের সাবেক সভাপতি মো. নুর ইসলাম বলেন, “৮০ বছরে কত সরকার এলো-গেল, কিন্তু শহরের বুকের মাঝখানের এই সমস্যার কেউই স্থায়ী সমাধান করল না। একটি আধুনিক শহর কি আজীবন বেইলি সেতু দিয়ে চলতে পারে?”
দুর্ভোগের শেষ নেই
সম্প্রতি আলীমুজ্জামান বেইলি সেতুতে আবারও সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় শহরজুড়ে নতুন করে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। ১০ ডিসেম্বর থেকে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকায় বিকল্প সড়কে চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, এমনকি রোগীবাহী যানবাহনও।
আশ্বাস থাকলেও নেই নির্দিষ্ট সময়সূচি
ফরিদপুর সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার জানান, সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আপাতত সংস্কারকাজ করা হচ্ছে এবং নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে কবে নাগাদ স্থায়ী পাকা সেতুর কাজ শুরু হবে—এ বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি দিতে পারেননি।
সংক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| সেতুর ধরন | বেইলি (অস্থায়ী) সেতু |
| অবস্থান | ময়রাপট্টি, হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজার, ফরিদপুর |
| ব্যবহারের সময়কাল | প্রায় ৮০ বছর |
| বার্ষিক সংস্কার ব্যয় | ৫০–৬০ লাখ টাকা (আনুমানিক) |
| সম্ভাব্য উপকারভোগী | প্রায় ৫০ লাখ মানুষ |
| যানজট কমার সম্ভাবনা | প্রায় ৬৬% |
ফরিদপুরবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই—আর কতদিন এই গুরুত্বপূর্ণ শহরটি অস্থায়ী সেতুর ঝুঁকি নিয়েই চলবে? স্থায়ী, নিরাপদ ও আধুনিক পাকা সেতু নির্মাণের দাবি দিন দিন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
