ভারতীয় সিনেমার স্বর্ণযুগে যাঁর নাম ছাড়া সঙ্গীতের ইতিহাস অসম্পূর্ণ, তিনি গীতা দত্ত। ‘তুমি যে আমার’ গানটি দিয়ে বাংলা সিনেমায় যেমন অমর তিনি, ‘মেরা নাম চিনচিন চু’ বা ‘বাবুজি ধীরে চলনা’র মতো গানে বলিউডে সমান প্রভাবশালী। অথচ তাঁর শেকড় বাংলাদেশের ফরিদপুরে, ১৯৩০ সালে জন্ম নেওয়া গীতাই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি।
ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারে জন্ম নিয়েও তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছিল মুম্বাইয়ের কঠিন নগরজীবনে। সংসারের টানাপোড়েন, সংগীত শেখার সীমিত সুযোগ, টিউশনি করে অর্থ উপার্জন—সবকিছুই একসময় তাঁকে নিয়ে আসে পণ্ডিত হনুমান প্রসাদের নজরে। এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে শুরু হয় তাঁর চলচ্চিত্রজীবন।
শচীন দেববর্মনের ‘দো ভাই’ তাঁকে প্রথম সারির গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। বেদনার আবেগমথিত গায়কিতে তিনি দ্রুত জোহরাবাই or নুরজাহানের সমসাময়িক গায়িকা হয়েও আলাদা পরিচয় গড়ে তোলেন। ভক্তিগীতি, আধুনিক রোমান্টিক গান, ক্লাবসং—সব ঘরানাতেই তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। বাংলার স্বরাঘাতকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগাতে জানতেন বলেই তাঁর গান ছিল অনন্য।
ব্যক্তিজীবনে গীতা দত্ত–গুরু দত্তের প্রেম, বিয়ে এবং বিচ্ছেদ ছিল আলোচিত। ক্যারিয়ারে অসামান্য সাফল্য পেলেও ব্যক্তিগত টানাপোড়েন তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। ওয়াহিদা রহমানকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের জটিলতা, গুরু দত্তের হতাশা এবং অবশেষে তাঁর মৃত্যু—এসবই গীতাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এরপর লতা–আশার আধিপত্যে তাঁর সুযোগ সীমিত হয়ে আসে।
যদিও ‘অনুভব’ (১৯৭১)-এ তাঁর গাওয়া গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয় হয়, তবুও শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে ফিরতে দেয়নি। যকৃতের রোগ, অর্থাভাব ও মানসিক ক্লান্তি—সব মিলিয়ে গীতার জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল কঠিন ও বেদনাদায়ক। ১৯৭২ সালের ২০ জুলাই শেষ হয় তাঁর বহুবর্ণিল যাত্রা।
তবুও সংগীতপ্রেমীরা আজও মনে করেন—বাংলাদেশের ফরিদপুরের এই কন্যা ভারতীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে অনন্যসুন্দর কণ্ঠগুলোর একটি। তাঁর গলায় যে আবেগ, তা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আজও শ্রোতাদের মনে অনুরণিত হয়।
