ফরিদপুরে জুতার আঠা, ফিটকিরি, নন-ফুডগ্রেড কেমিক্যাল রং, নিষিদ্ধ হাইড্রোজ ও নিম্নমানের চিটাগুড় ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ভেজাল খেজুর ও আখের গুড় উৎপাদনের একটি ভয়ংকর চিত্র সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই অনৈতিক ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তৈরি এসব ভেজাল পণ্য ফরিদপুর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলার শিবরামপুর ইউনিয়নের ছোট বটতলা এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছিল এই অবৈধ কারখানাটি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কারখানার মালিক স্বপন কুমার শীল চারপাশে টিনের উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটি বড় স্থাপনা নির্মাণ করেন, যার ভেতরে স্থাপন করা ছিল একাধিক সিসি ক্যামেরা। বাইরে থেকে ভেতরের কার্যক্রম বোঝার কোনো সুযোগ ছিল না। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাতদিন একটানা উৎপাদন চলত। প্রতিদিন ট্রাকে করে আনা হতো ভারতীয় নিম্নমানের চিটাগুড়, যা রাসায়নিক মিশিয়ে ‘খাঁটি’ খেজুর বা আখের গুড় হিসেবে বাজারজাত করা হতো।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কারখানাটি বহুদিন ধরেই সক্রিয় থাকলেও সেখানে প্রবেশের সাহস কেউ করত না। প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এটি পরিচালিত হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিকবার ভেজাল গুড় তৈরির অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লেও দীর্ঘ সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে থাকে।
সম্প্রতি অভিযোগের মাত্রা বাড়লে জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. আতিকুর রহমানের নেতৃত্বে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি যৌথ দল ওই কারখানায় অভিযান চালায়। তবে অভিযানের খবর পেয়ে মালিক ও কর্মচারীরা আগেই পালিয়ে যায়। কারখানায় ঢুকে কর্মকর্তারা যে চিত্র দেখেন, তা ছিল রীতিমতো আতঙ্কজনক।
অভিযানকালে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কেজি ভেজাল খেজুর ও আখের গুড়, বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান এবং গুড় তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে সেগুলো জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয় এবং পুরো কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব উপাদান মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং দীর্ঘদিন সেবনে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সহকারী কমিশনার মো. আতিকুর রহমান বলেন, “কারখানার মালিককে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাই নিরাপদ খাদ্য আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।” তিনি আরও জানান, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এ ধরনের অভিযানে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
ভেজাল গুড় তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদান ও সম্ভাব্য ক্ষতির একটি চিত্র নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—
| ব্যবহৃত উপাদান | প্রকৃতি | সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি |
|---|---|---|
| জুতার আঠা | শিল্প রাসায়নিক | লিভার ও কিডনি ক্ষতি |
| ফিটকিরি | অতিরিক্ত রাসায়নিক | হজমজনিত সমস্যা |
| নন-ফুডগ্রেড রং | বিষাক্ত রঞ্জক | ক্যানসারের ঝুঁকি |
| নিষিদ্ধ হাইড্রোজ | ক্ষতিকর রাসায়নিক | স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি |
| নিম্নমানের চিটাগুড় | অস্বাস্থ্যকর কাঁচামাল | খাদ্যে বিষক্রিয়া |
