প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলন: দাবি–আন্দোলন–আল্টিমেটাম—কঠোর অবস্থানে মন্ত্রণালয়

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের কর্মবিরতি নতুন মাত্রা নিয়েছে। দাবি আদায়ে তারা ১ ডিসেম্বর থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন এবং ৩ ডিসেম্বর থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ফলে সারাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চলছে তৃতীয় প্রান্তিক পরীক্ষার ব্যাঘাত, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে শিশুদের শিক্ষাজীবনে।

এই প্রেক্ষাপটেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়—অবিলম্বে কাজে না ফিরলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি অবস্থান: শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে ছাড় নয়

মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানায়, এই কর্মসূচি সরকারি চাকরির আচরণ বিধিমালার পরিপন্থী।
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—

  • পরীক্ষা নিতে অস্বীকৃতি

  • কিছু এলাকায় পরীক্ষা বাধাগ্রস্ত করা

  • অংশ নিতে চাওয়া শিক্ষকদের ওপর হামলার অভিযোগ

এ কারণে সরকার মনে করছে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করা কোনোভাবেই পেশাগত নৈতিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

শিক্ষকদের দাবিগুলো কী?

সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে তিনটি দাবি জানিয়ে আসছেন—
১) ১১তম গ্রেডে বেতন,
২) ১০ ও ১৬ বছর শেষে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার জটিলতা দূর করা,
৩) প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি নিশ্চিত করা

এই সব দাবিই শিক্ষকদের ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং পেশাগত মর্যাদার সঙ্গে জড়িত।

মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা: “আমরা কাজ করছি”

বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রণালয় জানায়—

  • অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।

  • পে-কমিশনকে ১১তম গ্রেডের বিষয়টি আগেই জানানো হয়েছে।

  • অর্থ বিভাগ আশ্বাস দিয়েছে—পে-কমিশনের প্রতিবেদন পেলেই কার্যক্রম শুরু হবে।

অর্থাৎ সরকারের দাবি—প্রক্রিয়া চলছে, কিন্তু আন্দোলনের কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে।

সংকটের তীব্রতা বাড়ার কারণ

এই পরিস্থিতির পেছনে শিক্ষক সমাজের একটি বড় ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে জমে ছিল।

  • প্রাথমিক শিক্ষকরা মনে করেন, তাদের দায়িত্বের পরিমাণ অনেক বেশি কিন্তু বেতন–গ্রেড প্রতিযোগিতামূলক নয়।

  • অনেকেই দাবি করেন, নতুন বেতন কাঠামোতে প্রাইমারি শিক্ষকদের উপেক্ষা করা হয়েছে।

  • পদোন্নতি ও সময়মতো উচ্চতর গ্রেড না পাওয়া কর্মস্পৃহায়ও প্রভাব ফেলছে।

এই অস্থিরতা থেকেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা: “কাজে ফিরুন, না হলে আইনগত ব্যবস্থা”

বিজ্ঞপ্তির শেষাংশে স্পষ্ট বলা হয়েছে—
সব সহকারী শিক্ষককে দ্রুত কাজে ফিরতে হবে এবং তৃতীয় প্রান্তিকের পরীক্ষা যথাসময়ে সম্পন্ন করতে হবে।

অন্যথায়—
✓ চাকরি আইন
✓ সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা
✓ প্রয়োজন হলে ফৌজদারি আইন
— অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানবিক বিশ্লেষণ

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা।
বিশেষত প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের শিক্ষায় ধারাবাহিকতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

  • পরীক্ষার ব্যাঘাত

  • অনিশ্চয়তা

  • অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা
    — এসব সংকট শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ায়।

অন্যদিকে শিক্ষকরা মনে করছেন—তারা আন্দোলন না করলে সমস্যা কখনোই সমাধান হবে না।
সরকার–শিক্ষক উভয় পক্ষের এই টানাপড়েন একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়—যেখানে সংলাপ ও সময়সীমাবদ্ধ প্রতিশ্রুতি জরুরি।

উপসংহার

সংবাদটি স্পষ্টভাবে বলে—
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শিক্ষক–সরকার দ্বন্দ্ব দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পড়বে ভবিষ্যত প্রজন্মের উপর। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আগেই উভয় পক্ষেরই সাধারণ সমাধানের পথে এগোনো প্রয়োজন।