প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ‘শাটডাউন’ স্থগিত: দাবির টানাপোড়েনে শিক্ষা ব্যবস্থায় অস্থিরতা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা তিন দফা দাবির পক্ষে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলমান কর্মবিরতি ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার পর আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এক শিক্ষকনেতা জানান, শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার ক্ষতি বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পরীক্ষার স্বার্থে সাময়িক সিদ্ধান্ত

শিক্ষকনেতা বলেন, “শিক্ষার্থীদের কোমল মন-মানসিকতা এবং বার্ষিক পরীক্ষার গুরুত্বের কথা বিবেচনায় রেখে শাটডাউন সাময়িকভাবে স্থগিত করছি। পরীক্ষা শেষে আবার নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।” রাতেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।

দেশজুড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় অচলাবস্থা

বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি; এখানে পড়ছে এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী। আর শিক্ষক রয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ। গত ২৭ নভেম্বর থেকে ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’ কর্মবিরতি শুরু করে। এরপর ধাপে ধাপে বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন ও পরে বিদ্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করা হয়।

এদিকে একই দাবিতে ‘সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ’–ও ২৩ থেকে ২৭ নভেম্বর কর্মবিরতি পালন করে এবং বৃহস্পতিবার থেকে ‘তালাবদ্ধ’ কর্মসূচি শুরু করে। এতে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত টানা চারদিন দেশের বহু বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। অনেক স্থানে শিক্ষকরা নিজেরাই স্কুলের ফটকে তালা লাগিয়ে দেন।

প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ

যেসব বিদ্যালয়ে পরীক্ষা বন্ধ ছিল, সেখানে স্থানীয় প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে। কোথাও তালা ভেঙে, কোথাও পুলিশ ও আনসারের পাহারায় পরীক্ষা নেওয়া হয়। তবে শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক জায়গায় ‘দায়সারা’ভাবে পরীক্ষা নেওয়া হলেও উত্তরপত্র মূল্যায়ন কীভাবে হবে—তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থান নেয়। বৃহস্পতিবার একাধিক শিক্ষকনেতাসহ অনেক শিক্ষককে প্রশাসনিক কারণে বদলি করা হয়। শিক্ষকদের অভিযোগ, এটি আন্দোলন ভাঙতে চাপ প্রয়োগের কৌশল।

দাবিগুলো কী?

শিক্ষকদের তিন দফা দাবি হলো—

  1. সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেড থেকে ১১তম গ্রেডে উন্নীতকরণ।

  2. ১০ ও ১৬ বছর চাকরি পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার জটিলতা দূর করা।

  3. সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির ব্যবস্থা।

শিক্ষকেরা দাবি করেন, একই যোগ্যতায় নিয়োগ পাওয়া অন্যান্য ক্যাডার-পেশাজীবীরা উন্নত গ্রেড ও পদোন্নতি সুবিধা পেলেও প্রাথমিক শিক্ষকরা বঞ্চিত।

শিক্ষকদের বক্তব্য

শিক্ষকদের ভাষ্যে, তাঁরা কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ক্ষতি চান না। তবে দাবিগুলো পূরণ না হলে পরীক্ষার পর আবারও আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

এক শিক্ষক বলেন, “শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তানস্বরূপ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনে যেতে বাধ্য হয়েছি। সরকার কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আবার কর্মসূচি শুরু হবে।”

পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ

এ মুহূর্তে পরীক্ষা চালু থাকায় অস্থিরতা কিছুটা কমলেও প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘদিনের বেতন-গ্রেড সমস্যা ও পদোন্নতি সংকট সমাধান না হলে আবারও অচলাবস্থার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।