প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দুই শ্রেণিতে পরীক্ষা ফিরছে

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে আবারও লিখিত পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন এলো। ২০২৩ সালে সংশোধিত জাতীয় শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের সময় এই দুই শ্রেণিতে সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষা-নির্ভরতা তুলে দিয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। মাত্র দুই বছরের মাথায় সেই সিদ্ধান্ত আংশিকভাবে প্রত্যাহার করে পুনরায় লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হলো, যা শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

নতুন শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের সময় যুক্তি ছিল—ছয় ও সাত বছর বয়সী শিশুদের ওপর অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ কমানো, তাদের শেখাকে আনন্দময় ও কার্যক্রমভিত্তিক করা এবং মানসিক ও সামাজিক বিকাশে সহায়তা করা। সে অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ, শ্রেণিকাজ, অংশগ্রহণ ও আচরণভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নকে সবচেয়ে উপযোগী মনে করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক মূল্যায়নে কর্তৃপক্ষের ধারণা হয়েছে, কেবল ধারাবাহিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করায় শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার অগ্রগতি পরিমাপে ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই “সমন্বিত মূল্যায়ন” মডেলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যকর নতুন মূল্যায়ন নির্দেশিকা অনুমোদন পায়। এরপর ১ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) শাহীনা সারমিন এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

নতুন কাঠামো অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে যেসব বিষয়ে নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক সহায়ক বই রয়েছে—সেগুলোতে ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং ৫০ শতাংশ লিখিত (সমাপনী) মূল্যায়ন থাকবে। অর্থাৎ বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মূল বিষয়ে আবার লিখিত পরীক্ষা হবে। অন্যদিকে চারু ও কারুকলা, শারীরিক শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মতো বিষয়গুলো কেবল শিক্ষক নির্দেশিকাভিত্তিক হওয়ায় সেগুলো পুরোপুরি ধারাবাহিক মূল্যায়নের আওতায় থাকবে।

তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পরীক্ষার গুরুত্ব আরও বাড়ানো হয়েছে। পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক বিষয়ে মোট নম্বরের ৭০ শতাংশ আসবে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে এবং বাকি ৩০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন থেকে। সহশিক্ষা কার্যক্রম আগের মতোই শতভাগ ধারাবাহিক পদ্ধতিতে মূল্যায়িত হবে।

নিচের সারণিতে নতুন মূল্যায়ন কাঠামোর তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো—

শ্রেণি স্তরবিষয় প্রকারধারাবাহিক মূল্যায়নলিখিত মূল্যায়ন
প্রথম–দ্বিতীয়পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক৫০%৫০%
প্রথম–দ্বিতীয়সহশিক্ষা কার্যক্রম১০০%নেই
তৃতীয়–পঞ্চমপাঠ্যপুস্তকভিত্তিক৩০%৭০%
তৃতীয়–পঞ্চমসহশিক্ষা কার্যক্রম১০০%নেই

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বছরে তিনবার—এপ্রিল, আগস্ট ও ডিসেম্বর—সমাপনী মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়। প্রশ্নপত্র প্রণয়নের দায়িত্ব বিদ্যালয়ের হলেও প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়গুলো যৌথভাবে কাজ করতে পারবে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অন্তত ৩০ শতাংশ প্রশ্ন সরাসরি পাঠ্যপুস্তকের অনুশীলনী থেকে নিতে হবে, যাতে পাঠদানের সঙ্গে মূল্যায়নের সামঞ্জস্য বজায় থাকে।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। সরকারের প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব মোরশেদ মনে করেন, অল্প বয়সী শিশুদের জন্য আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর মতে, কার্যকর শ্রেণিকক্ষ পাঠদান ও শক্তিশালী ধারাবাহিক মূল্যায়ন নিশ্চিত না করে শুধু পরীক্ষা ফিরিয়ে আনা হলে তা মূল সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিটি শিশুর সক্ষমতা অনুযায়ী শেখা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

দেশজুড়ে এক লাখের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দুই কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী এই ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে। ফলে মূল্যায়ন নীতিতে এমন পরিবর্তন বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক মান, শিক্ষণ-পদ্ধতি ও শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে—এ বিষয়ে সবাই একমত।