প্রবাসী কর্মীদের বীমা: নীতিমালা বনাম বাস্তবতার ফাঁক

বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক বীমা কার্যক্রম কয়েক বছর ধরে চালু থাকলেও বাস্তব চিত্র দেখাচ্ছে যে এর কার্যকারিতা এখনও অনেকাংশে সীমিত। নীতিমালায় আর্থিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বহু প্রবাসী ও তাদের পরিবার এখনও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

২০১৯ সালে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য এই বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়। এরপর ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে নতুন নীতিমালায় বীমার সর্বোচ্চ কাভারেজ ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রবাসীরা বিদেশ যাওয়ার সময় ১,০০০ টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে এই বীমা চালু করেন, যা পাঁচ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে। প্রিমিয়াম সংগ্রহ ও জীবন বীমা দাবির অর্থ পরিশোধের দায়িত্বে থাকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড।

নীতিমালায় প্রদত্ত সুবিধা

নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানকালে বা দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মৃত্যু হলে মনোনীত ব্যক্তি ১০ লাখ টাকা প্রাপ্ত হন। দুর্ঘটনায় দুই চোখ, দুই হাত বা দুই পা হারানোসহ স্থায়ী ও সম্পূর্ণ অক্ষমতার ক্ষেত্রে একই পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়। আংশিক অক্ষমতার ক্ষেত্রে ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত। এছাড়া, বিদেশে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বৈধ কারণে চাকরি হারালে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা পাওয়া যায়।

সুবিধার ধরনবীমার পরিমাণশর্তাবলী
মৃত্যু১০,০০,০০০ টাকানির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মৃত্যু
স্থায়ী সম্পূর্ণ অক্ষমতা১০,০০,০০০ টাকাদুই চোখ, দুই হাত বা দুই পা হারানো
আংশিক অক্ষমতা১,০০,০০০ – ৫,০০,০০০ টাকাক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী
চাকরি হারানোসর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকাবৈধ কারণে, বিদেশে যাওয়ার ৬ মাসের মধ্যে

বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জ

বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। আত্মহত্যার কারণে মৃত্যু হলে বীমা দাবি বাতিল হয়। গুরুতর অসুস্থতার কারণে দেশে ফেরা প্রবাসীরাও অনেক সময় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বিদ্যমান রোগ থাকলেও বীমা কার্যকর হয় না।

তথ্যপ্রাপ্তির ঘাটতিও সমস্যা বাড়াচ্ছে। অনেক প্রবাসী জানেন না যে তাদের নামে বাধ্যতামূলক বীমা রয়েছে বা কীভাবে দাবি করতে হয়। ফলে পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে জটিলতা সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে বিদেশ থেকে ডকুমেন্ট আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দালালচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বীমার টাকা পাইয়ে দেওয়ার নামে তারা বড় অঙ্কের কমিশন দাবি করছে, ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা দ্বিগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসীদের জন্য এই বীমা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, দাবি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, এবং দালালচক্র নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় ও প্রবাসী সংগঠনগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

এভাবেই প্রবাসী কর্মীদের আর্থিক সুরক্ষা কার্যকর হতে পারে, যাতে নীতিমালা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে জীবনের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।