পারস্য উপসাগরে জাহাজ বীমা সংকট বৃদ্ধি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচলের জন্য যুদ্ধঝুঁকি বীমা কভারেজ সীমিত বা প্রত্যাহার হওয়ায় আন্তর্জাতিক বীমা খাতে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামুদ্রিক বীমা কোম্পানিগুলো এই পরিস্থিতিতে ঋণ ও আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ফিচ রেটিংসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যেসব মার্কিন সম্পদ ও দুর্ঘটনা বীমা কোম্পানি পারস্য উপসাগরের জাহাজ চলাচলের ওপর বড় অংশের প্রিমিয়াম আয়ের জন্য নির্ভরশীল, তারা সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপে পড়তে পারে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যারা বহুমুখী ব্যবসায়িক কাঠামো বজায় রেখেছে এবং সামুদ্রিক যুদ্ধঝুঁকি তাদের মোট আয়ের ছোট অংশ, তাদের ওপর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে।

বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনার তীব্রতা। বিশেষত হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এই নৌপথে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং বৃহৎ পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক নাইট্রোজেন সার বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ এই পথে চলাচল করে। ফলে নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে শুধুমাত্র বীমা খাত নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য বাজারও বড় ধাক্কা পেতে পারে।

বর্তমান হিসাব অনুযায়ী পারস্য উপসাগরে প্রায় ২২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমমূল্যের জাহাজ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যদি একাধিক বড় তেলবাহী বা ক্রুজ জাহাজ ক্ষতির মুখে পড়ে, বৈশ্বিক বীমা শিল্পের সম্ভাব্য ক্ষতি ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে।

অনেক বীমা কোম্পানি ইতোমধ্যেই এই অঞ্চলের জন্য যুদ্ধঝুঁকি বীমা বাতিল বা সীমিত করেছে। ফলে জাহাজ মালিকদের নতুন করে বীমা নিতে হচ্ছে, যার প্রিমিয়াম আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে জাহাজের মূল্যের এক শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে, যা প্রতি যাত্রায় কয়েক লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি করছে।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি বিশেষ পুনর্বীমা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মূল উদ্দেশ্য হলো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখা এবং বীমা কোম্পানিগুলোর সম্ভাব্য বড় ক্ষতি সীমিত করা।

নিচের সারণিতে বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও বাণিজ্যিক সূচকগুলো তুলে ধরা হলো:

সূচকআনুমানিক পরিমাণ
পারস্য উপসাগরে ঝুঁকির মধ্যে থাকা জাহাজের মূল্যপ্রায় ২২.৫ বিলিয়ন ডলার
সম্ভাব্য বৈশ্বিক বীমা শিল্পের ক্ষতি৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি
বৈশ্বিক তেল সরবরাহে হরমুজ প্রণালীর অংশপ্রায় ২০%
বিশ্ব সার বাণিজ্যে এই নৌপথের অংশপ্রায় ৩০%
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পুনর্বীমা সহায়তাপ্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ১২ মাসে পরিস্থিতির প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে দুইটি বিষয়ের ওপর—সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন কতটা দীর্ঘ হয়। উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে জাহাজ আটকে পড়া, ক্ষতি বা জব্দ হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে এবং বীমা কোম্পানিগুলোর আয় ও মূলধন ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ তৈরি হবে।

তবে শক্তিশালী মূলধন ও বহুমুখী কাঠামো বজায় রাখা আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো এই সংকট সামাল দিতে সক্ষম। দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বীমা বাজারে ভারসাম্য ফিরে আসতে পারে। আপাতত, পারস্য উপসাগরের যুদ্ধঝুঁকি বীমা সংকট বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।