পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল স্মরণ

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের জীবন একেকটি নিঃশব্দ দলিল—সংগ্রাম, বিশ্বাসভঙ্গ, আত্মসম্মান ও নীতির গল্প। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ছিলেন সেই তালিকায় অমূল্য একজন। পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী হয়েও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে যান—যা ইতিহাসে আজও কম আলোচিত একটি অধ্যায়।

প্রারম্ভ ও রাজনৈতিক উত্থান

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৪ সালের ২৯ জানুয়ারি, বৃহত্তর বরিশাল জেলায়। তিনি ছিলেন অবিভক্ত ভারতের বাঙালি নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের একজন উজ্জ্বল প্রতিনিধি। সমাজের প্রান্তিক মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।

১৯৩৭ সালের অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক আইনসভা নির্বাচনে তিনি নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করে কংগ্রেস প্রার্থীকে পরাজিত করেন। এটি ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটনা। তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক দর্শনের অনুগামী ছিলেন। ১৯৪০ সালে নেতাজিকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কার করা হলে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লিগের সঙ্গে যুক্ত হন।

দলিত রাজনীতি ও আম্বেদকরের সঙ্গে সংযোগ

পরবর্তীতে মণ্ডল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভার সদস্য হন। এই সময়ে তিনি ড. বি. আর. আম্বেদকরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দলিত ফেডারেশনের বাংলা শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দলিত রাজনীতির সূচনা।

দেশভাগ ও পাকিস্তান

১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে তিনি নমঃশূদ্র সম্প্রদায়কে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম আইনসভার ৬৯ জন সদস্যের একজন হিসেবে নির্বাচিত হন এবং অস্থায়ী চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। পরবর্তীতে লিয়াকত আলি খানের মন্ত্রিসভায় আইন ও শ্রমমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান।

মূল রাজনৈতিক দায়িত্বসমূহ (১৯৪৭–১৯৫০)

দায়িত্বসময়কালমন্তব্য
পাকিস্তান আইনসভা সদস্য১৯৪৭–১৯৫০প্রথম আইনসভা সদস্যদের একজন
অস্থায়ী চেয়ারম্যান১৯৪৭আইনসভার কার্যক্রমের তদারকি
আইন ও শ্রমমন্ত্রী১৯৪৭–১৯৫০লিয়াকত আলি খানের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন

পদত্যাগ ও শেষ জীবন

পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রে হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য, নিপীড়ন ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ১৯৫০ সালের ৮ অক্টোবর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি পাকিস্তান ত্যাগ করে ভারতে চলে আসেন। ভারতে চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

১৯৬৮ সালের ৫ অক্টোবর বনগাঁতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের জীবন আমাদের শেখায়—রাজনৈতিক শক্তি নয়, নীতি ও আত্মসম্মানই চিরন্তন। তিনি ইতিহাসের সুবিধাজনক দলে নয়, সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যা তাকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে অনন্য ও অবিস্মরণীয় করে রেখেছে।