বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আমানত বা সঞ্চয়ের প্রবাহে এক অভাবনীয় জোয়ার পরিলক্ষিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সঞ্চয়কারীদের মধ্যে আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ফলেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। গত এক বছরের ব্যবধানে আমানতের পরিমাণ ১১.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২১ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
Table of Contents
আমানত প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান ও প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত কিছুটা টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। কিছু নির্দিষ্ট ব্যাংকে ঋণ অনিয়ম এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ার মতো ঘটনায় আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। ফলে সঞ্চয়কারীরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখিয়েছিলেন। তবে ২০২৫ সালে পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৬১টি ব্যাংকে মোট আমানতের পরিমাণ ২০ লাখ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে ২১ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
নিচে ব্যাংক আমানত ও ঋণের তুলনামূলক চিত্র একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | ২০২৪ সালের অবস্থা | ২০২৫ সালের অবস্থা | পরিবর্তনের হার (শতাংশ) |
| মোট আমানত | ১৮.৮৩ লাখ কোটি টাকা (প্রায়) | ২১ লাখ কোটি টাকা | ১১.৫১% (বৃদ্ধি) |
| মোট ঋণ ও অগ্রিম | ১৬.৮৩ লাখ কোটি টাকা (প্রায়) | ১৭.৭৭ লাখ কোটি টাকা | ৫.৬% (বৃদ্ধি) |
| আমানতের উৎস (বেসরকারি) | – | ৬৯.৫২% | – |
| আমানতের প্রবৃদ্ধি | নিম্নমুখী | ৫ বছরে সর্বোচ্চ | – |
আস্থার পুনরুদ্ধার ও বর্তমান প্রবণতা
ব্র্যাক ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহিউল ইসলাম এই প্রবৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থা পুনরায় ফিরে আসছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।” তবে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর মতে, আমানতের এই বড় অংশটি মূলত শীর্ষস্থানীয় ৭ থেকে ৮টি সবল ব্যাংকের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো এখনো সঞ্চয়কারীদের আকৃষ্ট করতে হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কিছুটা প্রশমিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা পুনরায় ব্যাংকে অর্থ জমা করতে শুরু করেছেন।
ঋণ বিতরণে সতর্কতা
আমানত বৃদ্ধি পেলেও ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছে। বছরের শেষে ঋণ ও অগ্রিমের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৫.৬ শতাংশ, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশ ধীর। এর পেছনে প্রধানত দুটি কারণ কাজ করছে: প্রথমত, ক্রমবর্ধমান সুদের হার এবং দ্বিতীয়ত, খেলাপি ঋণের (NPL) ঝুঁকি এড়াতে ব্যাংকগুলোর কঠোর ঋণ নীতি। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় ব্যাংকগুলো এখন গুণগত মান বজায় রেখে ঋণ প্রদানে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
উপসংহার
বেসরকারি ও ইসলামি ব্যাংকগুলো বর্তমানে মোট আমানতের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যার পরেই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবস্থান। আমানতের এই উল্লম্ফন ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ঋণ বিতরণে আরও স্বচ্ছতা আনা গেলে এই প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনবে।
